ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

কূটনীতি

বাংলাদেশের পরবর্তী গন্তব্য আসিয়ান?

বাংলাদেশের পরবর্তী গন্তব্য আসিয়ান?
×

ফয়সাল মাহমুদ

ফয়সাল মাহমুদ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গত কয়েক দশকে বড় পরিবর্তন খুব বেশি দেখা যায়নি। দক্ষিণ এশিয়া ঘিরেই কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কই ছিল নীতি নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংযোগ– প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসছে। ইন্দো-প্যাসিফিক এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্র। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আবেদন করেছে। এটি পূর্ণ সদস্যপদ নয়। তবে আসিয়ানের সঙ্গে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ, নির্দিষ্ট খাতে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে। বাস্তবতার বিচারে এটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রথম পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি অর্থনীতি। গত দুই দশকে দেশটি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকশিল্পে এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। ওষুধ, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালকা প্রকৌশল শিল্পেও সক্ষমতা বাড়ছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকারও বেড়েছে। অন্যদিকে আসিয়ানের অর্থনীতিও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানির অভিজ্ঞতা এবং বৃহৎ শ্রমবাজারের কারণে সম্ভাবনাময় অংশীদার।

শুধু কম মজুরির শ্রমিকের দেশ হিসেবেও বাংলাদেশকে আর দেখা যায় না। প্রতিবছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হচ্ছেন। দেশে পর্যাপ্ত উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প না থাকায় তাদের অনেকেই বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছেন। অন্যদিকে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে আসিয়ানের কয়েকটি দেশ। দক্ষ জনশক্তির এই চাহিদা ও সরবরাহকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা গেলে উভয় পক্ষই লাভবান হতে পারে।

বাংলাদেশের আরেকটি শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান। বঙ্গোপসাগর এখন শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করায় বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও ট্রান্সশিপমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আসিয়ানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাড়াতে চাইলে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের জন্যও সুবিধাজনক হবে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার প্রতিফলন এখনও বাণিজ্যে দেখা যায় না। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে হয়। অথচ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে এই হার অনেক বেশি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একই চিত্র। অর্থাৎ উভয় পক্ষের মধ্যে সম্ভাবনা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ এখনও সীমিত।

এই সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে বাংলাদেশের জন্য আরও একটি সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ভবিষ্যতে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) মতো বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ সহজ হবে। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে বাস্তব কিছু বাধাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা ভৌগোলিক পরিচয়। আসিয়ান সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন সদস্যকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ হতে হবে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হলেও আন্তর্জাতিকভাবে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

আসিয়ানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও সহজ নয়। সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে হয়। অর্থাৎ একটি দেশ আপত্তি তুললেও সদস্যপদের পথ আটকে যেতে পারে। তিমুর-লেস্তের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ণ সদস্য হতে এক দশকের বেশি সময় লেগেছে।

রোহিঙ্গা সংকটও বড় বিবেচ্য। বাংলাদেশ বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এই সংকটের মূল উৎস মিয়ানমার, যে আসিয়ানের সদস্য। ফলে বাংলাদেশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে কিছু সদস্যরাষ্ট্র সতর্ক থাকতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশেষ করে ভারত ও চীন ঘিরে আসিয়ানের ভেতরে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ধাপে ধাপে এগোনো। পূর্ণ সদস্যপদের পরিবর্তে প্রথমে সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনারের মর্যাদা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বন্দর, কাস্টমস, লজিস্টিকস, বাণিজ্য সুবিধা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। আসিয়ানের প্রতিটি সদস্য দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্নটি পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া না-পাওয়ার নয়। বড় প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান কোথায় দেখতে চায়। দক্ষিণ এশিয়ার বাজার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই বাংলাদেশের একমাত্র কৌশলগত পরিসর নয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ, আঞ্চলিক সংযোগ– সর্বক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ কারণেই আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এখন আর শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিকল্প নয়; বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

ফয়সাল মাহমুদ: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×