ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

রাষ্ট্রচিন্তা

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন কঠিন

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন কঠিন
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রায়ই অভিযোগ ওঠে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নেমে গেছে। কথাটা একাংশে হয়তো সত্য। তবে অপরাংশে সত্য হলো এটা, অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই শিক্ষার মানের ব্যাপারেও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী কিন্তু আগের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি জানে ও বোঝে; তবে তাদের সংখ্যা অধিক নয়। মানের নিম্নগমনের মূল দায়িত্বটা অবশ্য রাষ্ট্রেরই।

রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার মূল্য কমে গেছে এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে, যার প্রধান কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গণতান্ত্রিক পরিবেশের যথোপযুক্ত উন্নয়ন না ঘটা। উন্নয়ন কেন ঘটেনি, তার একটা ব্যাখ্যা নির্বাচিত ছাত্র সংসদের অকার্যকারিতার ভেতরে পাওয়া যাবে।

এটা সত্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। লড়াইটা চলছে দুই ফ্রন্টে– গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাপনার। বিশ্ববিদ্যালয় এই দুই কর্তব্যের কোনোটাতেই পিছিয়ে থাকেনি এবং সেখানেই এর গৌরব ও বৈশিষ্ট্য। 

বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান আহরণ, সৃষ্টি ও বিতরণ করে। কাজটা সামাজিক। ব্যক্তিই শিক্ষিত হয়, কিন্তু ব্যক্তির শিক্ষালাভ ঘটে সামাজিকভাবে; ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, ছাত্রদের নিজেদের ভেতরকার আদান-প্রদান, শিক্ষকের পারস্পরিক সহযোগিতায় গবেষণা এবং সমাজের সঙ্গে সংযোগের মধ্য দিয়ে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানা বলে কোনো কিছু নেই। জ্ঞান অর্জন, সৃষ্টি ও বিতরণ সবটাই ঘটে সামাজিকভাবে এবং জ্ঞান ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে না। রাখতে গেলে দুর্বল ও নষ্ট হয়ে যায়। জ্ঞানকে যত বিতরণ করা যায়, ততই তার বৃদ্ধি ঘটে। এক কথায়, বিশ্ববিদ্যালয় তাই একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।

গণতন্ত্র জিনিসটাও কেবল যে একটি শাসনপদ্ধতি, তা নয়। গণতন্ত্র একটি সংস্কৃতি, যার মূল কথাটা হচ্ছে নাগরিকদের মধ্যে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, যেটি না থাকলে গণতন্ত্রের প্রধান যে দুটি শর্ত, রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্র ও সমাজের সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যথার্থ জনপ্রতিনিধিত্বের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সে-দুটির কোনোটির অর্জনই সম্ভব নয়। অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা।

মানুষের সভ্যতার হাজার হাজার বছরের ইতিহাস অব্যাহত উন্নতির ইতিহাস। এই উন্নয়ন সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেছে। দাসব্যবস্থা ও সামন্তব্যবস্থা পার হয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এসে পৌঁছেছে এবং প্রাচুর্য, উদ্ভাবন, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভাবিতপূর্ব অর্জন সম্ভব হয়েছে। এই অগ্রগতি অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে, কিন্তু বদলাতে পারেনি সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা। আজকের দিনে উদারনৈতিক অর্থনীতিবিদরা পর্যন্ত স্বীকার করছেন, বিভাজনটা দাঁড়িয়েছে একজন বনাম নিরানব্বই জনে। অর্থাৎ যথার্থ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মিত্র ছিল না; শত্রুই ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের সম্মতির কারণ ছিল দুটি। প্রথমটি শিক্ষার মধ্য দিয়ে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা, যারা ব্রিটিশের অনুগত থাকবে এবং তাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখার কাজে সহযোগী হবে। দ্বিতীয় কারণ ১৯০৫ সালে বৃহৎ বঙ্গের প্রশাসনিক দ্বিখণ্ডীকরণের মধ্য দিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে যে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, তাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উন্নতির যে আশা সঞ্চারিত হয় সেই ব্যবস্থাপনা নাকচ হয়ে যাওয়ার কিছুটা ক্ষতিপূরণ দানে সম্মতি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে রাষ্ট্রের যে আগ্রহ ছিল, তা নয়। বঙ্গ বিভাজন পরিত্যক্ত হয় ১৯১১-তে; গড়িমসি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১৯২১ সালে। প্রতিষ্ঠার পরও বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক আনুকূল্য যেমনটা পাওয়ার কথা ছিল, সে পরিমাণে পায়নি। বিপরীতে রাষ্ট্র কর্তৃত্ব করেছে; করে আসছে।

রাষ্ট্রের চরিত্র ঔপনিবেশিক, তার আদর্শ ছিল পুঁজিবাদী শোষণ ও শাসিত দেশ থেকে সম্পদ পাচার। অপর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র সর্বদাই গণতান্ত্রিক। বিশ্ববিদ্যালয় তাই রাষ্ট্রশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজের ছিল বিশেষ ভূমিকা, এবং সে ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে থাকেনি। ব্রিটিশের বিভেদ-নীতি হিন্দু-মুসলিম পার্থক্যকে বিভেদে পরিণত করতে উস্কানি দিয়েছে। ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দাঙ্গায় বাইরেই থেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বরং দাঙ্গায় বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করতে ছুটে গেছে। রাষ্ট্র যেহেতু সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থের পাহারাদারি করে, তার স্বভাব তাই দাঁড়ায় অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ। তার বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা মায়ের মতো। মাতা যেমন তাঁর সন্তানদের ভেতর পার্থক্য দেখেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ও তেমনি তার সব ছাত্র ও শিক্ষককে সমান চোখে দেখে। 

ব্রিটিশের রাষ্ট্র ছিল পরিপূর্ণরূপে গণতন্ত্রবিরোধী। ১৯৪৭ সালে যে স্বাধীনতা এলো, তাতেও কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। রাষ্ট্রশাসনের ক্ষমতা চলে গেল সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতে। রাষ্ট্র চাইল পূর্ববঙ্গকে একটি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত করতে। রাষ্ট্রশাসকদের এই অভিপ্রায় পরিষ্কারভাবেই প্রকাশ পেয়েছে পাকিস্তানি ‘জাতি’র কথিত জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা-বক্তৃতায়। নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকদের ৫৬ শতাংশই বাঙালি– সুস্পষ্ট সেই সত্যকে অগ্রাহ্য করে তিনি যে ঘোষণা দিলেন– পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, তাতেই বোঝা গেল রাষ্ট্রের চরিত্রটা দাঁড়াবে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক।

এরপর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেটিতে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই। ভাষার দাবির মর্মবস্তুতে ছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জায়গায় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং ভাষা যেহেতু কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; ভাষাভাষী সব মানুষের তাতে সমান অধিকার, তাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ছিল প্রকৃতপক্ষে যথার্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠারই দাবি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ওই পক্ষেই এগিয়েছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের জনযুদ্ধ– সর্বক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা ছিলেন। তারা সংগ্রাম করেছেন ও প্রাণ দিয়েছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এই অভিযোগও উঠতে থাকে– গবেষণার ক্ষেত্রে অভাব দেখা দিয়েছে। এই অভিযোগ কিন্তু সত্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গবেষণা হয়; কিন্তু সব গবেষণা প্রকাশ পায় না, প্রচারও তেমন হয় না এবং গবেষণার ফল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রযুক্ত হয় না। গবেষণার পরিমাণ ও উপযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের যতটা নয়, তার চেয়ে অধিক রাষ্ট্রব্যবস্থার। 

যে আইনের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, তাতে বলা হয়েছিল– বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হবে শিক্ষাদান। শিক্ষা বোঝাতে ‘ইনস্ট্রাকশন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল; ওই শব্দটি কিন্তু প্রশিক্ষণ বোঝায়। প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশিক্ষণ দেয়নি, দিয়েছে শিক্ষা, যে শিক্ষা জ্ঞান বৃদ্ধি করে; জগৎকে বুঝতে এবং তাকে বদলাতে অনুপ্রেরণা জোগায়। দেশে কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×