সময় অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়: সোহেল রানা
সোহেল রানা। ছবি: সংগৃহীত
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪৪ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৬:০০
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) সেই চেনা প্রাঙ্গণে এখন আর আগের মতো প্রতিদিন আলো-ঝলমলে শুটিং হয় না। অনেক মুখ হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের উপস্থিতি এখনও সেই সোনালি দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। গেল শুক্রবার শিল্পী সমিতির নির্বাচনে ভোট দিতে এসে তেমনই এক অনুভূতির জন্ম দিলেন সোহেল রানা।
বয়স প্রায় আশির ঘরে। হাঁটার গতি আগের মতো নয়, কণ্ঠেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তবু চোখে এখনও রয়ে গেছে সেই পরিচিত দৃঢ়তা; যে দৃঢ়তা নিয়ে তিনি একদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন পথের সূচনা করেছিলেন। অভিনয়, প্রযোজনা, পরিচালনা, সংগঠন–পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সিনেমাই ছিল তাঁর জীবন।
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরতেই ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ-অপছন্দের কথা নয়, বরং চলচ্চিত্রের ভবিষ্যতের কথাই বললেন তিনি। ‘আমি সব সময়ই চেষ্টা করি, চলচ্চিত্র জগতের জন্য যার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মঙ্গল হবে, তাকেই নেতা নির্বাচিত করতে। এখানে কে বড় স্টার, সেটি বড় কথা নয়। আমি দেখি, সবকিছু সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবে, চলচ্চিত্রের সমস্যাগুলোর দায়িত্ব কে নিতে পারবে।’
কথাগুলো বলতে বলতে যেন তাঁর কণ্ঠে ফিরে আসে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভার। সময় তাঁকে শিখিয়েছে, তারকাখ্যাতি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু একটি শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে দায়িত্বশীল মানুষের ওপর।
এই কথাগুলো শুনতে শুনতেই মনে পড়ে যায় কয়েক মাস আগের আরেক বিকেলের কথা। তখন সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অভিনয় ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, জীবনের এক সময় আসে, যখন মানুষকে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়।
সেই কথার সূত্র ধরে বরেণ্য এই অভিনেতা বললেন, ‘সময় অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে সিনেমা, প্রযোজনা আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। এখন বয়স হয়েছে। শরীরের যেমন সীমা আছে, তেমনি মনেরও ক্লান্তি আছে। তাই মনে হয়েছে, থামার সময় এসেছে।’
অবসরের সিদ্ধান্তে আজও অনড় তিনি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর স্মৃতি। দর্শকের মনে যে মানুষটি বেঁচে থাকেন, তাঁকে যেন সময় কখনও ম্লান করে না দেয়।
‘আগের মতো ১৬-১৮ ঘণ্টা কাজ করার শক্তি আর নেই। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হয়। পরিবারও চায় আমি এখন বিশ্রামে থাকি। আমি চাই না, মানুষ আমাকে দেখে বলুক, আগের সেই সোহেল রানা আর নেই।’
তবে বিশ্রাম মানেই তাঁর কাছে বিদায় নয়। ক্যামেরার সামনে না থাকলেও চলচ্চিত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা এখনও আগের মতোই অটুট। শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে তিনি দেখেন চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে।
‘নির্বাচনের সময় সবাই আসে, দোয়া চায়। আমি বলি, শুধু দোয়া চাইলেই হবে না। আমাকে ভাবতে হবে, কার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বেশি উপকার হবে। চোখ বন্ধ করে ভোট দেওয়া ঠিক নয়।’ বলেন সোহেল রানা।
তাঁর বিশ্বাস, জনপ্রিয়তা আর নেতৃত্বের যোগ্যতা এক নয়। একজন বড় তারকা হয়তো দর্শকের হৃদয় জয় করতে পারেন, কিন্তু একটি সংগঠন চালাতে লাগে দূরদর্শিতা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ এবং শিল্পের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
আজকাল বেশির ভাগ সময় কাটে পরিবারের সঙ্গে। পুরোনো সিনেমা দেখেন, বই পড়েন, কখনও কখনও ফিরে যান নিজেরই অভিনীত ছবিগুলোর কাছে। স্মৃতির ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়ান জীবনের দীর্ঘ পথ। তবে সুযোগ এলে নতুন প্রজন্মের পাশে দাঁড়াতে চান। নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় তাদের পথ দেখাতে পারলে সেটিকেই জীবনের নতুন অর্জন বলে মনে করেন।
সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, বদলায় অগ্রাধিকারও। একসময় যিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কোটি দর্শকের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন, আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আরেক ভূমিকায়–একজন অভিভাবক হিসেবে। ব্যক্তিগত অর্জন, ক্ষমতা কিংবা তারকাখ্যাতির চেয়ে তাঁর কাছে এখন অনেক বড় একটি স্বপ্ন–সুস্থ, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ একটি চলচ্চিত্র শিল্প।
- বিষয় :
- সোহেল রানা
- নায়ক
- ঢালিউড
