ব্যবস্থাপনা ভালো, ব্যবস্থাপকের অভাব
ড. মাহবুবা নাসরীন
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০১
ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ বরাবরই দুর্যোগপ্রবণ। ইতোপূর্বে
বাংলাদেশ শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করলেও সাম্প্রতিক কিছু বছর থেকে
মানবসৃষ্ট দুর্যোগেরও সম্মুখীন হচ্ছে। দুর্যোগের কারণ হিসেবে বাংলাদেশে
বেশ কিছু বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থান অন্যতম।
হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো সাধারণত নিজেদের মধ্যে পানি ভাগাভাগি করে থাকে।
যারা উজানে বসবাস করে, তারা বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে পড়লে তার প্রভাব
পড়ে ভাটির দেশগুলোর ওপর। এসব দুর্যোগের বেশিরভাগই পানির সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমাদের দেশে দুর্যোগগুলো অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। উপকূলে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় ও
জলোচ্ছ্বাস হয়ে থাকে, তেমনি উত্তরাঞ্চলে হয় বন্যা। আবার হাওরাঞ্চল ও
বরেন্দ্র অঞ্চলের দুর্যোগ ভিন্ন। অন্য সব দুর্যোগের চেয়ে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার
কারণে আমাদের দেশে মানুষজন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।
আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় নতুন কিছু নয়। ১৭৯৭ সালে এ দেশে একটি বড় ঘূর্ণিঝড়
হয়েছিল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭৯৭ সালের পর সর্বশেষ বুলবুল পর্যন্ত এ
দেশে মোট ৪৮২টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। এগুলোতে উপকূলের মানুষজন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে। গড়ে প্রতি ৫ থেকে ১০ বছর পরপর একটি করে বড় ঘূর্ণিঝড় আসছে। সর্বশেষ
বুলবুলের পূর্বাভাস অনেক আগেই পাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে পর্যাপ্ত
প্রস্তুতি গ্রহণ সম্ভব হয়েছিল। বুলবুল তার ভয়ংকররূপে আঘাত হানেনি। এরপরও
বেশ কিছু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
১৯৭০ সাল ছিল নির্বাচনের বছর। ওই বছর একটি বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল।
গোর্কি নামের ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু
নির্বাচনের প্রচার বন্ধ রেখে দুর্যোগকবলিত এলাকায় ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু
এরপর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী আমাদের সহায়তা করার পরিবর্তে যুদ্ধ চাপিয়ে
দিয়েছিল। সেই সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তেমন ছিল না। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু
সর্বপ্রথম ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। কিন্তু বেশ কিছু
বছর পরও এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি আসেনি। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৮৭ ও
১৯৮৮ সালের বড় দুটি বন্যা থেকে। ১৭৯৭ সালের পর থেকে ১৯৭০ সালের পূর্ব
পর্যন্ত এ দেশের মানুষ যেমন ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে পরিচিত ছিল না, তেমনি ১৯৫৪-৫৫
সালের পর ১৯৮৭-৮৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত বন্যার সঙ্গেও পরিচিত ছিল না।
সুতরাং মানুষের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। বন্যা যেহেতু ঘূর্ণিঝড়ের মতো
আকর্ষিক আসে না, সঙ্গত কারণেই এতে কম প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে মানুষের
দুর্ভোগ অনেক বেশি হয়।
এই দুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো
কাঠামো ছিল না। এর ফলে মানুষ দুর্যোগে ত্রাণনির্ভর হয়ে পড়েছিল। তারা নিজের
মতো করে বাঁচার চেষ্টা করেছে। তাদের সেই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে
ততটা সমৃদ্ধ করেনি। ১৯৯১ সালে যখন একটি ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি
ঘটে তখন বোঝা গেল যে, বঙ্গবন্ধু যে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি চালু
করেছিলেন, তার প্রতি সুবিচার করা হয়নি। ওই কর্মসূচিকে এগিয়ে নিলে এবং
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে এত সংখ্যক মানুষের
প্রাণহানি ঘটত না। আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ। কিন্তু আমরা
মনে করতাম, দুর্যোগ প্রকৃতিগত, এখানে কিছু করার নেই। মানুষকে তাই বিশ্বাস
করানো হতো। ১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যা ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় আন্তর্জাতিক মহলের
দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তখন আন্তর্জাতিক মহলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের
পিছিয়ে থাকার বিষয়টি খুব আলোচিত হয়। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৯৩ সালে
বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো। ১৯৯৭ সালে দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত একটি স্থায়ী আদেশ আসে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীকালে
বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা
কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশে বেশ কিছু নীতিমালা প্রণয়ন হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০১২ সালে
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু তখন দেখা যায়, এসব নীতিমালা
বাস্তবায়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপক নেই। ২০০৯ সালে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের
সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন
ডিগ্রির ব্যবস্থা করে। এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এতে
আমরা ত্রাণনির্ভর থেকে ঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিতে চলে এসেছি।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে দুর্যোগে আক্রান্ত। এতে
কৃষি খাত, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোসহ সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা
যেভাবে উৎপাদন করতে চাই, সেভাবে উৎপাদন করতে পারি না। এ বছর বুলবুল আঘাত
হানার আগেই উপকূলে লবণাক্তের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এতে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ
কমে যাচ্ছে। বিকল্প পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা সেটা ভালোভাবে
করার সুবিধা পাচ্ছে। ফলে তারা আগে যেভাবে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখত,
দুর্যোগের পর আর সেভাবে পারছে না। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সময় সুন্দরবন আমাদের
জন্য কী করেছে, তা আমরা দেখেছি। সিডর, আইলা, সুনামিসহ বিভিন্ন সময় সুন্দরবন
এভাবেই বুক পেতে দিয়েছে। আমরা যদি উপকূলবাসীকে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতিমুক্ত
রাখতে চাই, তাহলে অবশ্যই সুন্দরবনসহ ওই এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে রক্ষা
করতে হবে। ওই এলাকায় কৃষি ছাড়াও আর কোনো শিল্প আছে কিনা তাও দেখতে হবে।
অনেকক্ষেত্রে কৃষি-নির্ভরতা কমাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগ
বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী দেশগুলো তাদের দায় নিচ্ছে না। সুতরাং এটা
আমাদেরই মোকাবিলা করতে হবে। যেখানে যে পদ্ধতিতে দুর্যোগ মোকাবিলা করা
দরকার, সেখানে তাই করতে হবে। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে আমরা ব্যতিক্রম দেখি।
হাওর এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তা কিন্তু ক্ষতি
করছে। গবেষণার মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধে টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অনেক ক্ষেত্রে নদী বা খাল দখল করা বা ভরাট করতে দেখা যাচ্ছে। একসময়
বাংলাদেশে আশ্রয়স্থল ছিল না। এখন কিন্তু সব মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা
সম্ভব। কারণ দুর্যোগ আসার অনেক আগেই আমরা সতর্কবার্তা পেয়ে যাচ্ছি। এমনকি
বন্যারও সতর্কবার্তা আসছে। বন্যাদুর্গতদের জন্যও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত
হচ্ছে।
প্রতিবছরই
ঘূর্ণিঝড়ের পর কবলিত এলাকায় প্রাণহানি, স্বাস্থ্যহানি, দরিদ্রতা ও সহিংসতা
বেড়ে যায়। অনেকেই ত্রাণনির্ভর হয়ে পড়ে। সব মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া
গেলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। সংস্কৃতিগত কারণে মানুষ নিজেদের সম্পদ
ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না। যদি তাদের সম্পদগুলো বীমার আওতায় আনা যায়,
তাহলে তারা কিছুটা কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুর্যোগকবলিতদের নিজস্ব লোকায়িত
কিছু জ্ঞান আছে। তাদের সেই জ্ঞানকে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজে লাগাতে হবে।
তাদের সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবাই বিনিয়োগ করতে চায়
না। দেশের বিত্তশালীদের এগিয়ে আসা দরকার। দুর্যোগকবলিতদের বিকল্প
কর্মসংস্থান, সুন্দরবন রক্ষায় উদ্যোগ, আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে
পারি, তাহলে দুর্যোগকবলিতরাও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সবার
অংশগ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো আবার বেশি
সম্ভাবনাময়। জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনেক। সে জন্য তারা দুর্যোগে
ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য দুর্যোগ এলে
দেশের সব মানুষ উদ্বিগ্ন থাকে।
গ্যারি বেকার নামে এক তাত্ত্বিক বলেছেন, যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে বেশি
উন্নত, সেসব দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াও উন্নত। কিন্তু বাংলাদেশের
ক্ষেত্রে আমরা এর ব্যতিক্রম দেখছি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যে অবস্থানে
রয়েছে, তার চেয়ে এ দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনেক সমৃদ্ধ। এরপরও আমরা
বজ্রপাত, ভবনধস, আগুন লাগার মতো কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ দেখছি।
এগুলো রোধ করতে যে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার, তা আমরা দেখছি না। পরার্থপরতা
কমিয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এরপরও একটি
স্বস্তির বিষয় দেখছি, স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতা। তারা বিভিন্ন পেশায় থেকেও
দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছেন। এই স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের আরও প্রসার
ঘটাতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপক নেই। এ বিষয়ে
ডিগ্রিধারীদের সুনির্দিষ্ট কোনো ক্যাডার নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কিন্তু
জনবল নিয়োগ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যদি সংশ্নিষ্ট বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক
জ্ঞানধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তারা আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা
রাখতে পারবে। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত শিক্ষা প্রাথমিক থেকে উচ্চস্তরে
বিন্যস্ত করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব এলাকার মানুষকে গুরুত্ব দিতে
হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যে সাফল্য, তা ধরে রাখতে হবে। উজানের
দেশের কোনো প্রকল্প বা পরিকল্পনা যাতে আমাদের ক্ষতির কারণ না হয়, সে জন্য
কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই।
অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- দুর্যোগ
- ড. মাহবুবা নাসরীন

