ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবল

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপ মঞ্চে

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপ মঞ্চে
×

আওয়ার মাবিল অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলছেন। ছবি: সংগৃহীত

আহসান হাবিব সম্রাট 

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১৯

সময়টা গত শতকের ৯০ দশকের মাঝামাঝি। সংঘাতের কারণে দক্ষিণ সুদানের এক দম্পতি কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। তাদের কোলজুড়ে আসে এক ছেলে, নাম রাখেন– আওয়ার মাবিল। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সে। শিশু বয়সেই ফুটবল খেলা ভালোবাসতে শুরু করে শিশুটি। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য ফুটবল সহজলভ্য ছিল না। অগত্যা বাতিল মোজা জমিয়ে কাপড়ের পুঁটলি করে ফুটবল বানিয়ে খেলতে শুরু করে মাবিল। ১০ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমায় সে। এরপর নদীর জল বহু দূর গড়িয়েছে। মাবিল এখন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সকারু দলের অন্যতম পোস্টার বয়। তিন বছর আগে যিনি বর্ষসেরা ‘ইয়াং অস্ট্রেলিয়ান’ হওয়ার গৌরব লাভ করেন।   

২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখার পর থেকেই একটু একটু করে স্বপ্ন বড় হতে শুরু করে মাবিলের। তাঁর পরিবার অ্যাডিলেইডে থিতু হওয়ার পর জীবনে আসতে শুরু করে নানা পরিবর্তন। স্থানীয় ফুটবল একাডেমিতে হাতেখড়ি হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে গতি ও সহজাত প্রতিভা দিয়ে নজর কাড়তে শুরু করেন। এক সময় পেশাদার ফুটবল অঙ্গনে নাম লেখান এই শরণার্থী সন্তান। এরপর সকারুদের যুব দলের পাইপলাইন বেয়ে জাতীয় দলে সুযোগ পান বর্তমানে স্প্যানিশ ক্লাব কাস্তেলোর এই মিডফিল্ডার। তবে মাবিল আনুষ্ঠানিকভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ২০২২ সালে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে পেরুর বিপক্ষে ম্যাচে। ওই ম্যাচে তাঁর নেওয়া পেনাল্টি শটে টুর্নামেন্টের মূল পর্বে ওঠে অস্ট্রেলিয়া। এর পরই তারকাখ্যাতি পেয়ে যান মাবিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এটাই ছিল আমার ও পরিবারের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়াকে ধন্যবাদ জানানোর একমাত্র উপায়। ধন্যবাদ অস্ট্রেলিয়া আমাদের নতুন ঠিকানা দেওয়ার জন্য।’ 

স্প্যানিশ ক্লাব সিডি কাস্তেলোর এই মিডফিল্ডার জীবনে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থানে। ফুটবলের জন্য শরণার্থীর মতোই ঘুরতে হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ২০ বছর বয়সে ডেনমার্কের মিডজিল্যান্ডে নাম লেখান তিনি। সেখানে নিজেকে মেলে ধরতে ব্যর্থ হন। এরপর ধারে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে থাকেন। সাত বছর পর স্পেনের কাদিজ ক্লাবে চুক্তিবদ্ধ হন। সেখানেও নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পারেননি। তুরস্ক, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের ক্লাবে খেলে এক পর্যায়ে বর্তমান ক্লাবে থিতু হন। কখনও আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকলেও নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। তবে মিডজিল্যান্ডের খেলার সময় থেকেই সকারুজ দলের রাডারে ছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার যুব দলে সুযোগ পাওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো সিনিয়র দলে ডাক পান তিনি। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুযোগ মেলেনি। 

কাকুমার শরণার্থীদের শিশুদের পাশে 

ফুটবলের মাধ্যমে তারকাখ্যাতি জুটেছে মাবিলের। কিন্তু কখনও শিকড় ভোলেননি সকারু দলের দুবারের এই বিশ্বকাপ সদস্য। পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকেই শরণার্থীদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন তিনি। মাবিল তাঁর ভাই ও এক সময়ের অ্যাডেলেইড ইউনাইটেড ক্লাবের সতীর্থ ওসামা মালিক, কূটনীতিবিদ র‍্যাচেল ওয়েস্ট ও ব্যবসায়ী আয়ান স্টিল মিলে ‘বেয়ারফুট টু বুটস’ নামের একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। যে ফাউন্ডেশনটি কাকুমা ক্যাম্পের শিশুদের জন্য নানা মানবিক সহায়তা দেয়। এক পর্যায়ে এই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সরকারও যুক্ত হয়। ফাউন্ডেশনটি কাকুমা ক্যাম্পে খাবার ও ওষুধ সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি সেখানকার শিশুদের জন্য ফুটবল, বুট ও জার্সি দেয়। মাবিল এখনও এই ফাউন্ডেশনে কাস্তেলো ক্লাব থেকে পাওয়া বেতনের একটি অংশ দান করেন এবং প্রতিবছর অন্তত একবার ফিরে যান শৈশবের কাকুমা ক্যাম্পে। 

আরও পড়ুন

×