ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে

ডাক্তার আসেন ১১টায়, চলে যান ১২টায়

ডাক্তার আসেন ১১টায়, চলে যান ১২টায়
×

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৯

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা ২৭ মিনিট। তখনও দরজায় ঝুলছে তালা। উড়েনি জাতীয় পতাকাও। আসেননি চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে তখনও সুনসান নীরবতা। এই অবস্থায় গতকাল রোববার ফিরে যেতে দেখা যায় সেবাপ্রত্যাশী রোগী ও স্বজনদের। 

এদিন সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে দরজার তালা খোলেন উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (এসএসিএসও) শারমিন আক্তার। তবে তখনও আসেননি কেন্দ্রটির ফার্মাসিস্ট নাসির উদ্দিন। অথচ সকাল ৮টার মধ্যে এই কর্মকর্তাদের কেন্দ্রে উপস্থিত থাকার কথা।

সকাল ১০টার দিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, তাঁর সন্তান ঠাণ্ডা, জ্বর-কাশিতে ভুগছে। হাসপাতালে তালা লাগানো। ডাক্তার আসেনি। ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে থেকে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। 
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকেরা সকাল ১০টা-১১টার আগে আসেন না। তবে ১২টা বাজলেই চলে যান। ঠিকঠাক ওষুধ দেন না। এমনকি ভেতরে নোংরা-আবর্জনায় ভরা। কোনো সেবা নেই হাসপাতালে। মানুষ এসে ফিরে যায়। সেবা না দিয়েই মাস শেষে বেতন তুলে নেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ নিয়ে বড় বড় কর্তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।

হাসপাতালটি খোলার পর সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়, বারান্দায় একটি বাঁশে বাঁধা রয়েছে জাতীয় পতাকা। পাশে ফার্মাসিস্টের কক্ষটি ময়লা-আবর্জনায় ভরপুর। জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে চেয়ার, টেবিল ও রোগীদের জন্য রাখা বেঞ্চটি। এসবের ওপরে থালাবাসন, প্লাস্টিকের বোতল, ছেঁড়া পলিথিন ও নোংরা কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আরও দুইটি কক্ষ একইভাবে যেন ময়লার স্তূপে পরিণত হয়ে আছে।

চাপড়া এলাকার বাসিন্দা মসলেম উদ্দিন বলেন, ডাক্তার ঠিকমতো আসেন না। ফার্মাসিস্ট নাসির মাঝেমধ্যে এসে হাসপাতাল খুলে পথে পথে ময়লা কাগজ কুড়িয়ে সেগুলো হাসপাতালের কক্ষে জমা করেন। বহুবার অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

ভাড়রা গ্রামের মনোয়র হোসেনে ছেলে সাইদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘নাসির হাসপাতালে না থেকেই বেতন তুলছেন। আর মহিলা ডাক্তার ১১টায় আসেন, ১২টায় যান। এসব দেখার কেউ নাই। সরকারের কেবল লাখ লাখ টাকা অপচয় হচ্ছে।’

এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (এসএসিএসও) শারমিন আক্তার। তিনি গতকাল সমকালকে বলেন, ‘শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় আজ একটু দেরি হয়েছে। তবে ফার্মাসিস্ট নিয়ে খুব যন্ত্রণায় আছি। ঠিকঠাক আসেন না, থাকেন না। কক্ষগুলো ময়লার স্তূপে পরিণত করে রেখেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানিয়েও কাজ হচ্ছে না।’ 

তিনি জানিয়েছেন, ফার্মাসিস্ট নাসির মানসিক রোগী। বিষয়টি স্যারেরাও জানেন।

মানসিক রোগে ভোগার কথা স্বীকার করেন ফার্মাসিস্ট নাসির উদ্দিন। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘৬০ হাজার টাকার বেশি বেতন তুলি! তিন মাস পর গতকাল (শনিবার) বাড়ি এসেছি। শরীরডা খারাপ। সেজন্য আজ যাইনি। পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে পথের ময়লা কুড়োই।’ তাঁর ভাষ্য, ডাক্তার না থাকলে তিনি নিজেই রোগী দেখেন, ওষুধ দেন।

জনবল সংকটের পাশপাশি অসুস্থ ফার্মাসিস্টের কারণে কেন্দ্রটির অবস্থা খুবই নাজুক বলে স্বীকার করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক শামীমা আক্তার। তিনি বলেন, বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানানো হবে। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

আরও পড়ুন

×