স্নায়ু চাপে মলিন ব্রাজিল
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৫০
সেবাস্তিয়ান স্মিথ, অল্প বয়সী ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক। নেইমারের নামে লেখা জার্সি পরে এসেছিলেন ম্যাচটি কভার করতে। পরিচয় হওয়ার পর থেকেই বলে যাচ্ছিলেন কত গোলে জিতবে তাদের দল। কে কে গোল করবেন, কীভাবে করবেন, সেটাও বলে যাচ্ছিলেন মরক্কোর সাংবাদিককে উত্তেজিত করতে। সেই তিনিই ম্যাচ শেষে হাত বাড়িয়ে বিদায় নিয়ে নিলেন! কিন্তু বিশ্বকাপ তো মাত্র শুরু? এরপর ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তিনি যা বললেন তার বাংলা অনেকটা এমন। ‘এই নিউ জার্সিতে আর ফাইনাল খেলতে আসতে হবে না ব্রাজিলের, তাই বিদায় নিয়ে রাখলাম।’ মরক্কোর কাছে ১-১ গোলে ড্র করেই কি তবে এতটা হতাশ সে দেশের মিডিয়া?
ম্যাচের পর মেটলাইফের আশপাশে রিও-সাও পাওলো থেকে আসা অনেক টেলিভিশন ক্যামেরাই গুটিয়ে রাখতে দেখা যায়। দর্শকদেরও মনে হয় যেন শোকের বাড়ি থেকে মাত্রই বেরিয়ে এলেন। তাদের জন্যই হয়তো কোচ কার্লো আনচেলত্তির মহান বাণী। ‘প্রথম ম্যাচের পরই ভাবা ঠিক হবে না যে দলের সবকিছু রাতারাতি নিখুঁত যাবে। আর প্রথম ম্যাচের ওপর ভিত্তি করে কেউ বিশ্বকাপ জিতে যায় না।’ খাঁটি কথা, গেলবার সৌদি আরবের কাছে হেরেও মেসিরা বিশ্বকাপ জিতেছিল। এবার মরক্কোর কাছে ধাক্কা খেয়ে ব্রাজিল কেন পারবে না। তবে কিনা তাদের দলে ভিনি ছাড়া অন্যদের কাউকেই এদিন বিশেষ কিছু মনে হয়নি।
আসলে ড্রয়ের জন্য নয়, মরক্কোর সঙ্গে যেভাবে মাঝমাঠের হাল দেখেছেন সমর্থকরা, আক্রমণেও সৃষ্টিশীলতার যে অভাব দেখেছেন, তাতে সেবাস্তিয়ানের মতো অনেকেই আর এই দলটি নিয়ে খুব বেশি ভরসা পাচ্ছেন না। মাঝমাঠে সেই বুড়ো ক্যাসেমিরো। ব্রুনো গুইমারেসের মাঝমাঠ মরক্কোর হাই ইনটেনসিটি বা তীব্রগতির প্রেস সামলাতে হিমশিম খেয়েছে। বারবার নিজেদের মধ্যে ভুল পাস দিয়েছে। মরক্কোর খেলোয়াড়দের শারীরিক আর ট্যাকটিক্যাল শক্তির সামনে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারদের বড্ড করুণ দেখিয়েছে। মরক্কোর ইসমায়ের সাইবারির গোলটি এই রক্ষণভাগের দুর্বলতার সুযোগেই হয়েছে। ব্রাজিলের লুকাস পাকেতা আর রজার ইবানিয়েজের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা বোঝাপড়ার ভুল হয়। সেই ব্রেক ডাউনাটাই কাজে লাগা সাইবারি। চিপ করে গোলকিপার অ্যালিসনের মাথার ওপর দিয়ে গোলের দেখা পান। আক্রমণ ভাগে ভিনি-রাফিনিয়া জুটির মধ্যে কোনো ছন্দই ছিল না এদিন। ভিনির বাড়ানো অন্তত দুটি পাসে রাফিনিয়ার সামনে সুযোগ ছিল গোল করার। কিন্তু তিনি তা পারনেনি, বরং শেষ দিকে নেইমারের প্রচণ্ড একটা শূন্যতা অনুভব করেছেন মেটলাইফ স্টেডিয়ামকে হুলুদ রঙে সাজিয়ে রাখা ব্রাজিলিয়ান দর্শকরা।
যদিও ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলন নামক আদালতে এসে হাজিরা দিয়েছিলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। কিন্তু ‘স্নায়ু চাপ’-এর অজুহাত ছাড়া কিছুই বলতে পারেননি। ‘আমার মনে হয়, ম্যাচটি প্রথমার্ধে খুবই কঠিন ছিল। খেলোয়াড়দের মধ্যে স্নায়ু চাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমরা প্রথমার্ধে মোটেও ভালো খেলিনি, অনেক বল হারিয়েছি এবং ওয়ান টু ওয়ান ডুয়েলেও পরাস্ত হয়েছি।’ ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছেন বটে, আশা না হারানোর অনুরোধটুকুও করেছেন। ‘এই ফলাফলে আমি পুরোপুরি হতাশও নই, আবার সন্তুষ্টও নই। মরক্কো সত্যিই খুব গোছানো এবং শক্তিশালী একটি দল। আমাদের মনোবল হারানোর কোনো কারণ নেই। আমরা শতভাগ আত্মবিশ্বাসী এবং পরের ম্যাচে শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়াব।’
কার্লোর কথাগুলো ব্রাজিলিয়ানদের পছন্দ হওয়ার কোনো কারণই নেই। যে ব্রাজিল দল একসময় বিশ্বফুটবলে ছড়ি ঘোরাত, সেই ব্রাজিল কিনা ভেঙে যায় স্নায়ুর চাপে! বিরক্ত রবার্তো কার্লোসকে দেখা গেল ম্যাচের পর স্টেডিয়াম থেকে হনহন করে বেরিয়ে যেতে। আসলে ব্রাজিলের সাবেক খেলোয়াড়দের একটা বড় অংশ চায়নি স্বদেশি কোচের প্রথা ভেঙে কার্লো আনচেলত্তির মতো কোনো ইউরোপিয়ানকে আনতে। তার পরও তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন অনেকে শুধু এই বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে।
সেখানেই কিনা ধরা পড়ল আনচেলত্তির এক ফাঁপা দল। ম্যাচটি ড্র করায় এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না এই ‘সি’ গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যাবে কে। যদিও ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া অন্তত ধরেই নিয়েছিল, তাদের দল নকআউট পর্বে গিয়ে নরওয়ে, পর্তুগালের মতো দলগুলোর মুখোমুখি হবে সেমিতে যাওয়ার আগে। কিন্তু আপাতত এই গ্যারান্টি দিতে পারছেন না হলুদ জার্সি পরে আসা সাংবাদিকের অনেকেই। তবে তাদের সবার মুখেই একটি আস্থা– ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আরও একজন আছেন যিনি কাল ডাগআউটে বসে ছিলেন মলিন মুখে। আপাতত যা খবর, ১৯ জুন হাইতির বিপক্ষে না হলেও ২৪ জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে অবশ্যই নামবেন নেইমার জুনিয়র। আপাতত তাঁর জাদু ছাড়া এই দলটিকে সত্যিকার অর্থেই সাহস জোগানোর বুঝি আর কেউ নেই।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- মরক্কো
- বিশ্বকাপ ফুটবল
