খুলনার কয়রা
ত্রাণের টাকা পেলেন জামায়াত এমপির এপিএস, আত্মীয়স্বজন
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৫২
আবু ওবাইদা খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস)। গত ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে যে সহায়তা এসেছে; কয়রা উপজেলায় বিতরণের ২০১ জনের তালিকায় তাঁর নামটি তিন নম্বরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে গরিব ও দুস্থ মানুষের তালিকা তৈরি করে অনেকটা গোপনেই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ওই তালিকা প্রকাশের পর আবু ওবাইদাসহ কয়েকজনের নাম দেখে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। তিনি কয়রা উপজেলার কয়রা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর অনুকূলে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলায় ২০১ জনের তালিকা করে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা বিতরণ দেখানো হয়েছে। বাকি টাকা পাইকগাছা উপজেলায় বিতরণের কথা।
কয়রা উপজেলার তালিকার এক নম্বরে আছে আহসান হাবিবের নাম। তিনি সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের ভাগনে। তিন নম্বর ক্রমিকের উপকারভোগী আবু ওবাইদার কথা শুরুতেই উল্লেখ করা হয়। ৬ নম্বরে থাকা আসমাতুল্যাহ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি। ১০ নম্বরে থাকা মাজহারুল ইসলাম কয়রা সদর ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি। এ ছাড়া তালিকায় বেশিরভাগ নামই এলাকার সচ্ছল ব্যক্তি। তাদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্যের এপিএস, আত্মীয়স্বজন ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বরাদ্দ থেকে ৪ হাজার করে টাকা পেয়েছেন। তবে অন্যদের দেওয়া হয়েছে দুই হাজার টাকা করে। উপকারভোগী অনেকেই এটিকে বৈষম্য হিসেবে দেখছেন। তালিকাভুক্ত নাসিমা খাতুন, রেহেনা পারভীন, ফাতেমা খাতুন, তাসলিমা বেগমসহ কয়েকজন বলেন, তাদের উপজেলা পরিষদে তাদের ডেকে ২ হাজার করে টাকা দিয়ে বলা হয়, এটি এমপির পক্ষ থেকে ঈদের খরচ। তবে অন্যদের ৪ হাজার দেওয়ার কথা জানতে পেরে তারা বিষ্মিত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাজহারুল ইসলাম ১০ বিঘা জমিতে চিংড়ি চাষ করেন। পারিবারিকভাবে তারা যথেষ্ট সচ্ছল। তালিকার ১৫২ নম্বরে তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম সরদারের নামও রয়েছে। সংসদ সদস্যের এপিএস আবু ওবাইদার স্ত্রী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। অনেক আগে থেকেই তাঁর পরিবার এলাকায় সম্পদশালী হিসেবে পরিচিত। অভিযুক্ত অন্যরাও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল।
ত্রাণ তহবিলের টাকা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্যের এপিএস পরিচয় দেওয়া আবু ওবাইদা বলেন, ‘এ তালিকা তো আপনাদের পাওয়ার কথা নয়। তালিকা গোপন থাকার কথা ছিল।’ টাকার প্রসঙ্গে বক্তব্য চাইলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। পরে ফোনের সংযোগ মেলেনি। এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, তালিকায় বেশির ভাগই গরিব-অসহায় মানুষের নাম আছে। এর মধ্যে কিছু দলীয় লোকজন থাকতে পারে, তবে তারাও দরিদ্র। সাংসদের এপিএসের নাম তালিকায় থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা কীভাবে হয়েছে জানা নেই।’
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বাবুল বলেন, ‘এমপি সাহেব গরিব মানুষের হক নষ্ট করে দলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা দিয়েছেন। তালিকায় থাকা বেশির ভাগই সচ্ছল। জেনে বুঝেই তাদের এই টাকা দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, ‘ত্রাণ তহবিলের টাকা যাদের পাওয়ার কথা, তাদের বঞ্চিত করে যদি সচ্ছল আত্মীয় ও দলীয় নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়- সেটা অন্যায়। আমাদের রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।’
কয়রার ইউএনও মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ত্রাণ তহবিলের টাকা হতদরিদ্র ও দুস্থদের মধ্যে বিতরণের কথা। তবে কোনো উৎসব উপলক্ষে বিশেষ বরাদ্দের তালিকা সংসদ সদস্য নিজেদের লোক দিয়েই করিয়ে থাকেন।
- বিষয় :
- খুলনা
