ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে অর্ধলাখ মানুষ

পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে অর্ধলাখ মানুষ
×

আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬

নাফ নদীর দুই তীরজুড়ে থাকা পাহাড় ও টিলার ঢালে পৌরসভার সবুজ বন আর টিলাবেষ্টিত নির্জন শিয়াল্ল্যা গুনা জনপদ এখন পাহাড়ি ঢল ও ঘর ধসে পড়ার শঙ্কা নিয়ে পরিণত হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ মানববসতিতে। অথচ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শুরু হলে স্থানীয় প্রশাসন একটি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা বানিয়ে মাইকিং করেই দায় সারছে। 

কক্সবাজারে টেকনাফের দক্ষিণ বন বিভাগের কার্যালয়ের পাশের পাহাড়ি এলাকা শিয়াল্ল্যা গুনাই শুধু নয়, পুরো সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের অন্তত ২০টি পাহাড় ও ১১টি টিলায় অবৈধভাবে বসবাস করছে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ। গত কয়েকদিনের থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিপাতে পাহাড় ধসের আশঙ্কা, মাটির ক্ষয় এবং প্রাণহানির ঝুঁকি জেনেও  বিকল্প আশ্রয় ও পুনর্বাসন উদ্যোগের অভাবে এই অনিরাপদ আবাস ছাড়তে পারছেন না তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, টেকনাফ পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের নাইট্যং পাড়াস্থল শিয়াল্ল্যা গুনায় পাহাড় ও টিলার ঢালে বাঁশ, টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি অসংখ্য ঘরবাড়ি। স্থানীয়দের ভাষ্য,  সামান্য ভাড়ায় আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ থাকায় ঝুঁকি জেনেও তারা এসব এলাকায় বসবাস করছেন।

পৌরসভাস্থল শিয়াল্ল্যা গুনা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখিয়ে বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর ধরে এখানে বাস করছি। ঢলে আমার ঘরের একাংশ ধসে পড়েছে। বাধ্য হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ইটের ছোট নতুন কক্ষ বানিয়েছি। ঝুঁকির কথা জানি, কিন্তু যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।’ 

প্রায় ১৫ বছর আগে স্থানীয় এক ব্যক্তি মো. জমিরের কাছ থেকে পাহাড়ি জমির দখল স্বত্ব কিনে শিয়াল্ল্যা গুনায় বসতি গড়েন মোহাম্মদ কাজল। পাহাড়ের পাদদেশে তিন কক্ষের বসতঘরে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে থাকেন। কাজল বলেন, ‘আগে ভাড়া বাসায় থাকতাম। খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হতো। বাধ্য হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে কিছু জমির দখল স্বত্ব কিনে বসতি শুরু করি। অভাব-অনটনের কারণেই এখানে আসতে হয়েছে। এখানে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকতে হয়। প্রাণহানির ভয় সবসময় কাজ করে।’ একই এলাকার আরেক বাসিন্দা স্বামীহারা নুর কলিমা। সম্প্রতি তাঁর স্বামী মো. ছবিরান সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। পাহাড়ের ঢালে তার ঘরটি দূর থেকে পাখির বাসার মতোই মনে হয়। সন্তানসহ সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে সেখানে প্রায় এক দশক ধরে আছেন তিনি। নুর কলিমা বলেন, ‘সামর্থ্য না থাকায় পাহাড়ি জমি দখল করে এখানে বসবাস শুরু করি। বর্ষাকাল এলেই কোন পাহাড় কখন ভেঙ্গে পড়ে সেই শঙ্কায় থাকি। বিশেষ করে বৃষ্টিতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের পাহাড়ি সরু পথ দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।’

শুধু নুর কলিমা, জাকির বা কাজল নন; নুর নাহার, মমতাজ বেগম ও এলেমা খাতুনের মতো অসংখ্য পরিবারও পাহাড় ধসের আশঙ্কা নিয়েই এক অনিরাপদ জীবনযাপন করছেন। 

টেকনাফ দক্ষিণ বন বিভাগ ও উপজেলার প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি পাহাড় ও ১১টি টিলায় বসতি আছে। বন বিভাগের ৩৯ হাজার হেক্টর বনভূমিতে সব মিলিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকসহ অর্ধলাখ মানুষ। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে উপজেলা পরিষদসংলগ্ন ফকিরামোরা, ধুমপেরাং ঘোনা, গিলাতলি, বৈদ্যরঘোনা, নাজিরঘোনা, শিয়াইল্যার ঘোনা, উরমের ছড়া, নতুন পল্লানপাড়া, পুরান পল্লানপাড়া, বরবইতলী, নাইট্যংপাড়া, ব্যাটালিয়নসংলগ্ন মাঠপাড়া, জাহালিয়াপাড়া, রোজার ঘোনা, রঙ্গিখালী, আকবরপাড়া, সিকদারপাড়া, মরিচ্যাগুনা, উলুচামারী, লেচুয়া প্রাং, পানখালী, উত্তর সিকদারপাড়া, হলবনিয়া, আছারবনিয়া, মিনাবাজার ও শামলাপুর। 

বন বিভাগ সূত্র অনুসারে, গত কয়েক দশকে টেকনাফে পাহাড় ধসে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। সেদিন টেকনাফের ফকিরামোরা, টুন্ন্যামোরা ও হ্নীলা সিকদারপাড়ায় পাহাড় ধসে ৩৪ জন নিহত হন। একই ঘটনায় দেড় শতাধিক বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ২০০৯ সালের ৪ ও ৬ জুলাই ফকিরামোরা ও টুন্ন্যামোড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের চার সদস্যসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়। আরও আগে, ১৯৮৯ সালে ফকিরামোরায় এক পরিবারের সাতজনসহ ১১ জন প্রাণ হারান।

পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী কয়েকজন বাসিন্দার ভাষায়, ‘পাহাড় ধসে মানুষ মারা গেলে সবাই নড়েচড়ে বসে। কিন্তু কিছুদিন পর সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়।’ তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই পারে মৃত্যু কমাতে।

বন বিভাগের টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ আহমেদ বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় নতুন কোনো অবৈধ বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বন বিভাগ কাজ করছে।’

টেকনাফের ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে উপজেলার পাহাড় ধসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে কীভাবে স্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়েও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।’ 

আরও পড়ুন

×