ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুদ্রা রাক্ষস বিষয়ক জটিলতা

মুদ্রা রাক্ষস বিষয়ক জটিলতা
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১০

শীতকালে দুপুরবেলায় গ্রামবাংলার দাওয়াত অথবা জেয়াফতের কথা মনে পড়ে। সকালবেলায় গরু বা খাসি জবাই হয়ে গেছে। মসলা বাটার কাজ আগের রাতে শেষ হয়েছে। কয়েকটি বড় বড় ডেকচিতে গরম পানি ফুটছে। পাশেই পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু পাশ দিয়ে হাঁটা যাচ্ছে না। কারণ পেঁয়াজের প্রবল ঝাঁজে চোখে পানি এসে পড়ছে। রান্নাবান্নার এক ফাঁকে পোলাওয়ের চাল ফুটছে আর পাশেই কুচি কুচি করে দেওয়া পেঁয়াজ ভাজা হচ্ছে। সেই ভাজা পেঁয়াজ ছড়িয়ে দেবে পোলাও এবং মাংসের ওপর। প্রতিটি তরকারিতে পেঁয়াজের উপস্থিতি প্রবল। দুপুরের দিকে পরিবেশন করা হচ্ছে পোলাও, ভাত, মাংস, শীতের সবজি ও লাউ দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল, সবশেষে দই। আমন্ত্রিতরা পরম তৃপ্তিতে খাওয়া-দাওয়া সাঙ্গ করে পান চিবুতে চিবুতে শীতের বিকেল হয়ে যেত। এর মধ্যে বেশ কিছু খাদককে কত খেতে পারে, তার একটা প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে যেত। অতি শীর্ণ এক খাদক হয়তো প্রথম স্থান অধিকার করত। সে প্রায় তিন পোয়া চালের পোলাও ও আধা সের চালের ভাতের সঙ্গে প্রায় চারটি বড় বাটি মাংস পেটে চালান করে দিয়েছে। তারপর দুটি দইয়ের হাঁড়ি এবং আধা সের রসগোল্লা খেয়ে একটুখানি ঢেকুর তুলছে এবং জানিয়ে যাচ্ছে, রাতে তার আরেকটা দাওয়াত আছে।


এমনি একটি খাদ্যপ্রিয় বাঙালির জীবনে নেমে এসেছে খাদ্যের প্রবল সংকোচন। কোনো রকম দুর্ভিক্ষ হয়নি, মঙ্গা হয়নি বা দেশে কোনো আকাল পড়েনি। তবুও চলছে এক সরব ও নীরব আকাল। এ আকাল দেখা যায় না। হাড্ডিসার মানুষও দেখা যায় না; কিন্তু মানুষের চোখেমুখে একটা অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা যায়, যার সূচনা হয়েছে পেঁয়াজ-মূল্যের উল্লল্ফম্ফন দেখে। এরপর লবণেরও একটা সংকট দেখা যাচ্ছিল, যদিও দ্রুত সেটা সামাল দেওয়া গেছে। কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চাল ও সবজির দামের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা যাচ্ছে না। আরও একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে, লবণের দাম বাড়বে বলে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লবণ একরাতের মধ্যে কিনে ফেলেছে। ফলে বাজারে লবণের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। পেঁয়াজের অভাব দূর করার জন্য মিসর, চীন, মিয়ানমার, পাকিস্তান থেকে জল, স্থল ও আকাশপথে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। সেগুলোর চেহারা বিচিত্র রকম। কোনো এক দেশের পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করলে রান্না কালো হয়ে যায়। আবার কোনো দেশের পেঁয়াজে কোনো ঝাঁজ নেই, অনেকটা আলুর মতো। এ তো গেল সাধারণ মানুষের কথা, মানুষের খাদ্যের প্রয়োজনীয়তার কথা। কিন্তু যে খাদক প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল, সেই খাদকের স্থান দখল করেছে বেশ কিছু খাদক। এই খাদকরা নিজেরা সে রকম খেতে পারে না; কিন্তু তারা খাদ্যের বদলে খায় টাকা। বলা যায় মুদ্রা রাক্ষস।

এই মুদ্রা রাক্ষসরা বহুকালজুড়েই আছে। পর্যটক হিউয়েন সাঙ যখন ভারতবর্ষে এসেছিলেন, তখন ভারতের পূর্বাঞ্চলে এবং উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে লিখে গেছেন। স্থানের নাম তেমনভাবে উল্লেখ করেননি; তবে অনুমান করা যায়- একটি বাংলা, অন্যটি মহারাষ্ট্র। ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে বলেছেন- এরা অসৎ, প্রতারক ও কোনো ধরনের ন্যায়নীতির ধার ধারেন না। নিশ্চয়ই হিউয়েন সাঙ ভীষণভাবে প্রতারিত অথবা ভেজাল খাবার খেয়ে ধরাশায়ী হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার বর্ণনা তিনি তার ভ্রমণকাহিনিতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এসব কারণেই পাঠ্যপুস্তকে একসময় দুধে পানি মেশানোর অঙ্ক স্থান পেয়েছিল। এসব মুদ্রা রাক্ষস এতই দূরদর্শী যে, তারা অপেক্ষায় থাকে। সেই অপেক্ষার শুরু আমাদের জানা ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ভয়াবহ লবণের সংকট হয়েছিল। সে সময় ব্যবসায়ীরা লবণের কারবার করে রাতারাতি হাজার থেকে লাখ, লাখ থেকে কোটিপতি হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় গুদামে প্রচুর চাল থাকা সত্ত্বেও এবং বাংলায় সর্বোচ্চ ফলন হলেও খাদ্যের অভাবে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। দুটি বিশ্বযুদ্ধ সারাবিশ্বের মানুষের জন্য যত দুর্ভোগই নিয়ে আসুক না কেন, কিছু ব্যবসায়ীর কপাল খুলে গিয়েছিল। যে কোনো পালা-পার্বণে বা ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠানে যখন মানুষ উৎসাহিত হয়ে উন্নতমানের খাবারের আয়োজন করতে চায়, তার আগে থেকেই অসাধু ব্যবসায়ীরা লক্ষ্য স্থির করে ফেলেন। এ যাত্রায় কোনো জিনিসের দাম কতটা বাড়াতে হয়।

একবার বাড়াতে পারলে সেটি আর কমছে না। আধুনিককালে বাজেট আসার আগেই ব্যবসায়ীরা টের পেয়ে যান কোন জিনিসটার ওপর কতটা ট্যাক্স পড়তে পারে। সেটাকে সামনে রেখে অসাধু ব্যবসায়ীরা দ্রুত গোপনে বাজারজাত করে বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই উচ্চমূল্যে বাজারে ছেড়ে দেন। মুদ্রা রাক্ষসরা শিশুখাদ্যে পর্যন্ত ভেজাল দিয়ে থাকে। কারণ শিশুরা কষ্টটা প্রকাশ করলেও কান্না ছাড়া আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারে না। এই ভেজাল প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যায় ওষুধপত্রও। একবার তরল প্যারাসিটামল খেয়ে অনেক শিশু প্রাণ হারিয়েছিল। বহু বছর ধরে সেসব ব্যক্তির অল্প কিছু সাজাও দেওয়া হয়েছিল। খাদ্যের ব্যাপারে সারা পৃথিবীতে আইনে হয়তো সাজার ব্যবস্থা আছে; কিন্তু সেই ব্যবস্থা নিতে হয় বলে জানা যায় না। কারণ বিষয়টি এতই মানবিক যে, কোনো মানুষ নামধারী প্রাণী এ কাজটি করতে চায় না। কোনো বিশেষ পরিদর্শকের ব্যবস্থা সেখানে নেই। কিন্তু আমাদের দেশে সব বিষয়ে মন্ত্রণালয় আছে। তারপর আছে পৌরষভা। পৌরসভার কাজ অবশ্য তেমন দেখা যায় না, শুধু ট্যাক্সের বিষয়টি ছাড়া। আর মাঝেমধ্যে প্রকাশ্য দিবালোকে অনেক লোকজনের সামনে কাজ করতে দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ স্থানে স্তূপীকৃত হয়ে থাকে। একটু বৃষ্টি হলেই রবীন্দ্রনাথের সেই কিনু গোয়ালার গলির মতো রাজপথগুলো নোংরা হয়ে থাকে। হাটবাজারগুলো সাধারণত পৌরসভার অধীন অনুমান করি। রেস্তোরাঁ, হোটেল এগুলোর ওপর নজরদারিরও ব্যবস্থা আছে। মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখা যায়; তিনি পুলিশ পাহারায় গিয়ে জরিমানাও করে থাকেন। এই জরিমানার টাকা তুলতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো নতুন পন্থা গ্রহণ করেন; যেখান থেকে খুব দ্রুত জরিমানার টাকা উঠে আসবে। তার মানে খাদক এখন মুদ্রা রাক্ষস অসাধু ব্যবসায়ী; কিন্তু অন্যদিকে জনসচেতনতার বড়ই অভাব।

আমাদের প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে জিনিসপত্রের দাম দু'এক পয়সা বাড়লেই জনগণ খেপে ওঠে। একসময় কলকাতায় ট্রামের ভাড়া এক পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তাই নিয়ে ঐতিহাসিক একটা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেখানেও যে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে না তা নয়; কিন্তু তা অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং মধ্যবিত্তের নাগালের ভেতর। শুনেছি, ওখানেও পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। বেড়ে তেমন একটা সুবিধা হবে না: কারণ সেদেশের অধিকাংশ মানুষ পেঁয়াজ খায় না। কিন্তু আমাদের এখানে পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করা একটা অবাস্তব ঘটনা। কিন্তু সম্প্রতি পেঁয়াজ না খাওয়ারও একটা প্রবণতা গড়ে উঠেছে। আমি নিজেও পেঁয়াজ ছাড়া রান্না খাওয়ায় প্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। কিন্তু বাঙালির রসনা চর্চায় পেঁয়াজকে যদি বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সত্যিই অসাধু ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করা হবে। এ রকম ঘটনা যদি পাঞ্জাবে বা পাকিস্তানে ঘটে, তাহলে কী হবে? সেখানে একটা রুটি একটি বড় পেঁয়াজ দিয়ে খেয়ে তারা তাদের মধ্যাহ্নভোজ সমাপ্ত করে থাকে। আগেই অশনিসংকেতের কথা বলেছি। লবণের একটা ছোট্ট হাহাকারেই এক সন্ধ্যায় বাজার লোপাট হয়ে গেল। কারণ পেঁয়াজ ছাড়াও চলে; কিন্তু লবণ ছাড়া চলবে না। অথচ বাংলাদেশ লবণ প্রস্তুতকারী দেশ। এ দেশে লবণের ঘাটতি হওয়ার কোনো কারণই নেই। ভয় হচ্ছে শীতের সবজি নিয়ে। একটা ছোট্ট ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অথচ এখন কিন্তু সবজির মৌসুম। সম্প্রতি সমকালের একটি প্রতিবেদনে দেখলাম, তিন হাত ঘুরে বেড়েছে সবজির দাম। উৎপাদক বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্যমূল্য থেকে, ভোক্তার পকেট কাটা যাচ্ছে আর মধ্যস্বত্বভোগীরা ফুলেফেঁপে উঠছে। চালের দামও বাড়ছে। 'চালবাজি' চলছে চালের দাম নিয়ে। একবার থিতু হয়ে গেলে সেটা কমবে না। যাদের মুদ্রা রাক্ষস বলেছি এবং যারা দাম বাড়ার কাজে নিয়োজিত, তারা কিন্তু কখনই উৎপাদন করে না।

উৎপাদন করে কৃষক আর মাঝখান থেকে তা নানা হাত হয়ে এসে পড়ে যারা চাল কেনে। মাঝখানের যে হাতগুলো সেগুলোই মুদ্রা রাক্ষসের অদৃশ্য হাত। কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে, প্রায়শই ধান বিক্রি করতে এসে ঠিক দাম না পেয়ে আগুন দিয়ে দিচ্ছে অথবা হাটবাজারে ফেলে দিয়ে যাচ্ছে। এমন অনেক জায়গায় দেখেছি, ফসল ফলাবার পর বাজারে নেওয়ার জন্য যে পরিবহন খরচ লাগে, তার অভাবে ক্ষেতেই রেখে দিচ্ছে অথবা অতি অল্প মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছে। এসব তো গেল সমস্যার কথা। এর কি আশু কোনো সমাধান আছে? সমাধানটা একেবারেই রাজনৈতিক; সেই সমাধান করতে গেলে সরকারকে তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ শুরু করতে হবে। যার নিয়ামক হবে যারা উৎপাদন করে তারা। মাঝখানের মধ্যস্বত্বভোগীরা নয়। সচিবালয়ে সভার পর সভা করেও এ সমস্যার সমাধান হবে না। দৃষ্টি দিতে হবে উৎসে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব



আরও পড়ুন

×