ঠগবাজ ঠিকাদারদের অভিভাবক কারা
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৫
আজ একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শুরু করতে চাই। কল্পিত গল্প নয়, সত্য ঘটনা।
ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে (সম্ভবত ১৯৩৭ সালে)।
বর্তমানের বৃহত্তর বরিশালের পটুয়াখালী কেন্দ্রে নির্বাচন দুটিতে প্রার্থী
দুই নেতা, শেরেবাংলা (তখনও শেরেবাংলা হননি) একে ফজলুল হক এবং ঢাকার নবাব
পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দিন। নাজিমুদ্দিনের বিরাট জমিদারি পটুয়াখালীতে
বিস্তৃত ছিল। ফলে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন, তার প্রজারা তাকে দলে দলে ভোট দেবে।
তাছাড়া তার রয়েছে প্রচুর অর্থবিত্ত। সুতরাং টাকার জোরে তিনি জিতে যাবেন।
অন্যদিকে হক সাহেবের তখন তেমন অর্থবিত্ত নেই। ওকালতি করে জীবনযাপন করেন।
নাজিমুদ্দিনকে রেখে ভোটদাতারা তাকে ভোট দেবেন কেন? নাজিমুদ্দিন পটুয়াখালীর
মানুষকে বিস্তর প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি পটুয়াখালীতে নারীদের জন্য একটি
সরকারি স্কুল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। শহরের প্রতিটি রাস্তা প্রশস্ত ও
পাকা করবেন। চাষিদের বকেয়া ঋণ মওকুফ করবেন। সরকারি হাসপাতালের উন্নয়ন
ঘটাবেন ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। ভোটদান কেন্দ্রের পাশে বিরাট ভোজনশালা
খুললেন। সেখানে ভোটদানের দিন প্রত্যেক ভোটারকে পোলাও-বিরিয়ানি খাওয়ানোর
ব্যবস্থা হলো।
হক সাহেবও শহরে ভোটদান কেন্দ্রের পাশেই তারও নির্বাচনী প্রচার কেন্দ্র
স্থাপন করেছিলেন। সেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বললেন, ভাইসব, আমাকে ভোট
দিয়ে নির্বাচিত করলে নাজিমুদ্দিন সাহেবের মতো অত কিছু করতে পারব না। তিনি
জমিদার মানুষ। আমি আপনাদের কৃষক প্রজা দলের মানুষ। আমি নির্বাচিত হলে
আপনাদের জন্য ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করব। আর কিছু পারব না। আর একটা অনুরোধ,
আপনারা সবাই নাজিমুদ্দিন সাহেবের নির্বাচন কেন্দ্রে গিয়ে বিরিয়ানি-পোলাও
খাবেন। তারপর আমার বাক্সে আপনার মূল্যবান ভোটটি দিয়ে আমার নির্বাচন
কেন্দ্রে এসে পান-সুপারি খেয়ে এবং হুক্কা টেনে বাড়ি যাবেন। পটুয়াখালীর
ভোটদাতারা তা-ই করেছিলেন এবং হক সাহেব ওই নির্বাচনে ল্যান্ড স্লাইড বিজয়ের
অধিকারী হয়েছিলেন। নিজের জমিদারিতে পরাজিত হয়েছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন।
গল্পটা
লিখলাম এ জন্য যে, এখন আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা-উপনেতাই বক্তৃতা দিতে
গিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা বলেন। উন্নয়নের জন্য গর্ব প্রকাশ করেন। দেশের
সত্যই উন্নয়ন ঘটেছে। এটা অভাবনীয় উন্নতি। কিন্তু এই দেশেরই একশ্রেণির মানুষ
সেই উন্নয়নের তলা ফুটো করে রেখেছে। ফলে উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করতে পারছে
না। শেখ হাসিনার সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বে তাক
লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দেশটির অসংখ্য সেতু, যা মানুষের যাতায়াত ও
ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নিত্যপ্রয়োজনে লাগে- এমন বহু সেতু দেশের একশ্রেণির
ঠিকাদারের দুর্নীতি ও অবহেলায় ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে। তাতে
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হচ্ছে। যাতায়াত সমস্যায় সাধারণ মানুষ ভুগছে।
ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে না পারায় তাদের শিক্ষার ক্ষতি হচ্ছে। মাল চলাচল
ঠিকমতো হচ্ছে না, আরও কত কী?
এ ধরনের একটি সেতুর বিবরণ দিয়েছে ঢাকার একটি বাংলা দৈনিক তাদের ২৪
নভেম্বরের সংখ্যায়। শুধু খবর প্রকাশ নয়, এ নিয়ে তারা প্রধান সম্পাদকীয়
পর্যন্ত লিখেছে। এ সেতুটি রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারের ধামসেনা ইউনিয়নে
অবস্থিত। ২০১১ সাল থেকে চলছে এই সেতুটি নির্মাণ নিয়ে অমার্জনীয় ছেলেখেলা।
দৈনিক পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, '২০১১ সালে সেতুটি নির্মাণের
উদ্যোগ নিয়েছিল স্থানীয় সরকারের প্রকৌশল অধিদপ্তর। একটি ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠান দুই কোটি ৩৮ লাখ টাকায় সেতুটি নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল।
চুক্তি অনুযায়ী ২০১৩ সালের মার্চ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু
আংশিক কাজ করে ৮২ লাখ ১৭ হাজার টাকা অগ্রিম তুলে নিয়ে ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানটি চম্পট দেয়।
তিন বছর পর ২০১৬ সালে আরেকটি ঠিকাদারি সংস্থা প্রায় দুই কোটি টাকায় কাজটি
করার জন্য চুক্তি সই করে। ২০১৭ সালের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা। তারাও ৭৮
লাখ ৩৫ হাজার টাকা অগ্রিম তুলে গায়েব হয়। আরও একটি ঠিকাদারি সংস্থা এক কোটি
৮০ লাখ টাকায় কাজটি করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। তারাও আগের ঠিকাদারদের
পদাঙ্ক অনুসরণ করে। অবশেষে এ বছর দরপত্র আহ্বান করা হলে দুই কোটি ৮০ লাখ
টাকায় কাজটি করার জন্য নতুন একটি ঠিকাদারি সংস্থা দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
কিন্তু গত সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি।
রাজধানীর একেবারে বুকের কাছে সাভারের একটি ব্রিজ নিয়ে যদি এমন ঘটনা ঘটতে
পারে, তাহলে দেশের অন্যান্য স্থানে নির্মীয়মাণ ও মেরামতের দরকার রাস্তাঘাট ও
সেতুর অবস্থা কী, তা সহজেই অনুমেয়। এক পদ্মা সেতুর ছবি দেখিয়ে দেশের আসল
চিত্র আমরা কী করে ঢাকব? এই যে বারবার ঠিকাদারি কোম্পানির চালবাজি, যাতে
সরকারি অর্থের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে বিরাটভাবে, সে
জন্য স্থানীয় মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সরকারি কর্মচারীদের
কোনো জবাবদিহি কি নেই? ঠিকাদারদের কাজের তদারকি করার জন্য সরকারের কয়েক
স্তরে প্রকৌশলীরা রয়েছেন। তারাই-বা কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন? নাকি
ঠিকাদারদের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগসাজশ আছে? নইলে একাধিক ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠান তাদের চোখের সামনে অগ্রিম টাকা তুলে গায়েব হয় কী করে? তারা
গায়েব হয়ে না থাকলে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি কেন? মাত্র একটি
ঠিকাদারি কোম্পানির কাছ থেকে যৎসামান্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে।
বিচিত্র এ দেশ! হায় সেলুকাস! এত ভঙ্গ তবু রঙের অভাব নেই। এটা জিয়া, এরশাদ
বা খালেদার আমল নয় যে, এসকান্দর মামা অথবা চকলেট খালার দৌলতে আলাদিনের
গুহার চিচিং ফাঁক খেলা চলবে। এটা একটা গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচিত
জনপ্রতিনিধিদের শাসনের যুগ। এ যুগেও যদি রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণ নিয়ে
এরশাদ ও খালেদা যুগের কাণ্ডকারখানা চলে, তাহলে মানুষ কাদের কাছে গিয়ে
দাঁড়াবে? বিএনপি আমলে টাঙ্গাইলে অসংখ্য ভাঙা সেতু বা ব্রিজের মেরামতের
চুক্তি করে কাজ না করেই টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল আমাদের বীরউত্তম
কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। এ জন্য দুষ্ট লোকে তার নাম দিয়েছিল 'ব্রিজ
সিদ্দিকী'। গুজব রটেছিল- এটাও নাকি হয়েছিল কাদের সিদ্দিকীর 'পুতুল ভাবির'
আদরে-প্রশ্রয়ে।
কিন্তু এটা তো 'পুতুল ভাবির' রাজত্বের যুগ নয়, এটা 'বাপের বেটি' শেখ
হাসিনার রাজত্বকাল। একালে ঘরের এত কাছে সাভারের এই পুকুর চুরির ঘটনা ঘটে কী
করে? আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তদন্ত চালানোর অনুরোধ জানাই।
প্রধানমন্ত্রী দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য কঠোর শুদ্ধি অভিযান শুরু
করেছেন। তার কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, এই শুদ্ধি অভিযানের সীমানা বাড়ান।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং সরকারি দপ্তর ও
অধিদপ্তরগুলোকেও এর আওতায় আনা প্রয়োজন। কেবল যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের
রথের চাকা পিষ্ট করে লাভ কী? তাদের পৃষ্ঠপোষক বড় চোরের দল এখনও ফেরেশতা
সেজে গণভবন থেকে শুরু করে সরকারের প্রতিটি দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের ধরা
না হলে শুদ্ধি অভিযান সম্পূর্ণ সফল হবে না।
দীর্ঘকাল ঢাকায় বাস করেছি। নিকটবর্তী সাভারে আমার বহু বন্ধুবান্ধব আছেন।
ঢাকার দৈনিকে সাভারের এই ব্রিজটি সম্পর্কে সম্পাদকীয় পাঠ করে নিজেও এলাকার
বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। তারা বলেছেন আরও ভয়ংকর কথা।
এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারিনি। যে অভিযোগ তাদের মুখে শুনেছি, তাই
এখানে তুলে দিচ্ছি। তারা বলেছেন, এই ঠিকাদার গোষ্ঠী পেশাদার ও সৎ গোষ্ঠী
নয়। এদের পেছনে পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে এক শ্রেণির মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপজেলা
চেয়ারম্যান। তাদের এজেন্ট হয়ে কাজ করে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একশ্রেণির নেতা।
সামনে শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া রাখা হয় কোনো অসাধু ঠিকাদারকে। এদের চাপ ও
হুমকির কাছে সরকারের দপ্তর ও অধিদপ্তর অসহায়। শুধু সাভার নয়, এই অবস্থা
দেশের ৬৪টি জেলার সর্বত্র, অধিকাংশ রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণের বেলায়
বিরাজিত। আর অধিক লিখলাম না। যদিও লেখার ছিল। এই লেখাটি আমার সাধারণ পাঠকের
জন্য তো বটেই, দেশের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও
লিখলাম।
লেখার শুরুতেই হক সাহেবের নির্বাচন-সংক্রান্ত গল্পটির উল্লেখ করেছি এ জন্য
যে- প্রমাণিত হয়েছে, কোনো কোনো দেশে বড় বড় উন্নয়নের বদলে ছোট ছোট উন্নয়নে
মানুষের মন জয় করা গেছে বেশি। আকাশচুম্বী অট্টালিকার দেশ নিউইয়র্ক যখন
সন্ত্রাসী ও পকেটমারে ভরপুর, নিয়মিত ময়লা নিস্কাশন না হওয়ার দরুন শহরের
বাতাস, পানি দূষিত, তখন নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে এক ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত
প্রার্থী শহরবাসীকে বলেছিলেন, 'আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো
ম্যানহাটনতুল্য সুউচ্চ অট্টালিকার আরও এলাকা তৈরি, ক্যাসিনোর সংখ্যা
বৃদ্ধির অঙ্গীকার করতে পারব না। আমার অঙ্গীকার, আমি শুধু নিউইয়র্কের বাতাস ও
পানি দূষণমুক্ত এবং নিউইয়র্কের রাস্তা সন্ত্রাস ও পকেটমারমুক্ত করব।
এই মানুষটিকেই বিপুলভাবে ভোট দিয়ে নিউইয়র্কের মানুষ মেয়র পদে বসিয়েছিল।
তিনি তার প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন এবং নিউইয়র্কের বাতাস ও পানি দূষণমুক্ত এবং
রাস্তা সন্ত্রাসীমুক্ত করেছিলেন। বাংলাদেশে হক সাহেব যেমন করেছিলেন গরিবের
জন্য ডাল-ভাতের ব্যবস্থা; নিউইয়র্কের ওই মেয়র শহরের বাতাস ও পানি
দূষণমুক্ত করে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিলেন যে, নিউইয়র্কের অদূরে তার নামে একটি
বিমানবন্দর তৈরি করা হয়েছে। ঢাকার মেয়ররা তার উদাহরণ অনুসরণ করতে পেরেছেন
কি?
লন্ডন, ৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০১৯
- বিষয় :
- কালের আয়নায়
- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

