পাঁচ দশকে মিশ্র অনুভূতির বাংলাদেশ
ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৬
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি আদর্শ ও অঙ্গীকারের ভিত্তিতে। আদর্শ ও অঙ্গীকার ছিল গণতন্ত্রকে নিয়ে। উপরন্তু নৈয়ায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি ছিল তিনটি- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। এ দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ যুদ্ধবিধ্বস্ত হিসেবে। ড. হেনরি কিসিঞ্জার তো অভিশম্পাত দিয়েছিলেন- বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হবে। সুতরাং এ ধারণার ভিত্তিতেই ৪৮ বছরের বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করতে হবে। '৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এই দেশকে গড়ে তোলার ১৫টি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। অন্তত দুটি নির্দেশনার কথা প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা যেতে পারে।
এক. বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে; দুই. বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে, যার ভিত্তি কোনো ধর্মভিত্তিক হবে না। এখন প্রশ্ন হলো, ৪৮ বছরের বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর এসব দিকনির্দেশনা কতটুকু অনুসরণ করেছে? যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন ১৩১৪ দিন। পরিস্থিতির প্রতিকূলতায় তাকে বাকশাল নামের পরীক্ষাধর্মী একটি ব্যবস্থা চালু করতে হয়েছিল, যা আরও পেয়েছিল ২৩২ দিন। কিন্তু এই সময় বাংলাদেশের সব সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বাকশাল নিয়ে দুটি কথা আছে- এক. কোনো বিশেষ দল নয় বরং একটি জাতীয় মঞ্চ ছিল বাকশাল; দুই. বঙ্গবন্ধুর জবানিতেই আছে, বাকশাল কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়; বরং একটি সাময়িক বিকল্প ছিল মাত্র।
পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই বাংলাদেশ ছিল পথহারা। এক কথায় বলতে গেলে, এই সময় বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল পাকিস্তান অভিমুখে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল ভূলুণ্ঠিত। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিচারে এই সময়ের বাংলাদেশ পাকিস্তানের অনুরূপ ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশবিরোধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুখ থুবড়ে পড়ে, যখন দেখা যায় হন্তারক নিজামী মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে চলাফেরা করেন। উপরন্তু দুর্নীতি আর জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্য হয়েছিল তখনকার বাংলাদেশ। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের অবৈধ সামরিক স্বৈরাচার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছিল। খালেদা জিয়া যখন বাংলাদেশবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন, তখন তো আর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সুতরাং '৭৫ থেকে '৯৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ এবং ২০০১ থেকে ২০০৭-এর বাংলাদেশ ছিল অপচয়িত ও অবক্ষায়িত বাংলাদেশ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৮ থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পথে হাঁটছে- এমন একটি বিশ্বাস বিরাজমান। তা সত্ত্বেও অনুপুঙ্খ বিচারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পথে পরিক্রমা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ।
'৭২-এর তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশে এখন তলানিসমৃদ্ধ একটি ঝুড়ি আছে; ঝুড়িটি উপচে পড়ছে। বাংলাদেশের নজরকাড়া প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি সারাবিশ্বের প্রশংসা পেয়েছে, এতে আমরা গর্বিত। কিন্তু একই সমান্তরালে এ দেশে ধনবৈষম্য ক্রমবর্ধমান। এখন এ দেশে যেনতেন প্রকারে ধনী হওয়া সহজ। সহজে ধনী হওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।
কাজেই এমন একটি উপসংহার অনিবার্য হয়, বৈষম্য ক্রমবর্ধমান রেখে উন্নয়নের জয়গান গাওয়া যায় না। উন্নয়ন হলো সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের পূর্বশর্ত, তবে উন্নয়ন নয়। তবুও আমাদের যে অর্জন তা তো যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে। সরকারকে অবশ্যই বৈষম্য কমানোর জন্য সুস্পষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ধনী ব্যবসায়ীর নয়; মানুষের দেশ, যাদের স্বস্তি স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক বৈষয়িক অগ্রযাত্রায় বিগত ৪৮ বছরে বাংলাদেশ কৃতিধন্য; তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্খলন ও আদর্শিক বিচ্যুতি বেদনাদায়ক। যে গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, সেই গণতন্ত্র এখনও তো পায়ের তলায় শক্ত মাটি পায়নি। বাংলাদেশে এখন যা বিরাজমান তাকে গণতন্ত্র বলা কঠিন; যা আছে তাকে বলতে হবে ডেমোস্ক্লেরোসিস। স্ক্লেরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে মানবদেহের ধমনি শুকিয়ে যায়, রক্তের সঞ্চালন ব্যাহত হয়। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মানবদেহ অস্তিত্বমান হলেও তা সচল-সজীব থাকে না। অর্থাৎ আমাদের গণতন্ত্র আছে; কিন্তু তার জীবনীশক্তি নেই। অনেকটা কাজীর গরুর মতো, যা কাগজে থাকে, কিন্তু গোয়ালে থাকে না। প্রশ্নাতীত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমাদের অর্জন এখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুষঙ্গী নয়।
আদর্শিক বিচ্যুতি বড় বেদনাদায়ক। যে রাষ্ট্রে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তার ভিত্তি অনিবার্যভাবে ধর্মীয়, যা বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রেত ছিল না। গোবিন্দগঞ্জ, নাসিরনগর ও রামুর মতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বিপন্ন-বিস্ময়।
সরকারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী হেফাজতের সখ্য বড় বেদনাদায়ক। আর হেফাজতের সুপারিশে পাঠ্যপুস্তকে বিষয়বস্তুর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে অচিন্তনীয়।
লক্ষণীয়, রাষ্ট্রধর্মের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাও সংবিধানে আছে। ফলে সংবিধান এখন এক আদর্শিক জগাখিচুড়ির দলিল।
আমাদের ৪৮ বছরের অর্জন-বিয়োজনে কার ভূমিকা কতটুকু, সে প্রসঙ্গটি উল্লেখ্য হতে পারে। নির্দিষ্টভাবে এটা বলা যায় যে, অর্জনে জনগণের কৃতি আছে। অন্যদিকে, বিয়োজনে রাজনীতি ও নেতৃত্বের ঘাটতি আছে। তবে ৪৮ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে বটে; কিন্তু যেভাবে যেদিকে এগোনোর কথা ছিল, তা হয়নি। আমরা হতাশ নই, তবে আমাদের মিশ্র অনুভূতি আছে।
বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
- বিষয় :
- বিজয় দিবস
- ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
