ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খাদ্য অধিদপ্তর

সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা!

সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা!
×

ফাইল ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২০ | ১৩:৪৩

'গরিবের পুষ্টি চাল বিতরণে'র ব্যর্থতাই কেবল নয় বরং শুক্রবারের সমকালের প্রতিবেদনে দুঃখজনকভাবে আমরা দেখছি, খাদ্য অধিদপ্তরের প্রায় সব প্রকল্পেই রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতি অভিযোগ। সেখানে একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠলেও এবং কর্তৃপক্ষ জানার পরও যে 'ব্যবস্থা' গ্রহণের কথা সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। খাদ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য অভিযুক্ত হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তারা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টি মিশ্রিত চাল বিতরণের যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু মুজিববর্ষের অধিকাংশ সময় পার হওয়ার পরও চাল বিতরণের কাজ শুরু না হওয়া কেবল বিস্ময়করই নয় বরং হতাশাজনকইও বটে। মার্চ-এপ্রিলে পুষ্টি চাল কার্যক্রমের বাধা হিসেবে করোনার বিষয়টি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হতে পারে না। বরং আমরা দেখেছি, মহামারির ওই সময়েও কীভাবে নানা ব্যক্তি ও সংগঠন চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী তথা ত্রাণ কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। অথচ 'লকডাউনে'র ওই সময়ে দরিদ্র মানুষ এ চাল পেলে একদিকে যেমন উপকৃত হতো, অন্যদিকে মুজিববর্ষের মধ্যেই বিতরণও সম্পন্ন হলে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্যও সফল হতো। কিন্তু সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে, কর্তৃপক্ষ পুষ্টি চাল সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে ডিলারদের তথ্য গোপন রাখার শর্ত দিয়ে অসাধু পন্থায় ভিজিডি প্রকল্প থেকে কিছু পুষ্টি চাল নিয়ে মুজিববর্ষের কথা বলে উল্লেখযোগ্য উপজেলায় বিতরণ করেছে। আরও অবাক করার বিষয়, ভিজিডি প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যের এই চাল টাকার বিনিময়ে ডিলারদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি কর্মকর্তারা উৎকোচও নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একটি মহতী উদ্যোগ কীভাবে ব্যর্থতায় এবং ব্যর্থতা থেকে অনিয়মের কারণ হতে পারে এটিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কেবল এখানেই নয়, খাদ্য অধিপ্তরের গম কেলেংকারিতেও উঠে এসেছে অধিদপ্তরটির কর্মকর্তা কর্মচারীর নাম। নিবন্ধনকৃত আটার মিল মালিকরা সক্ষমতা অনুযায়ী অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসে যে পরিমাণ গম বরাদ্দ পান, বেশিরভাগ মিলার সেই গম না ভাঙিয়েই সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ওই গম বরাদ্দের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন, যারা মিল মালিকদের কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে অবৈধভাবে বিক্রি করেন। ফলে সরকারি ব্যবস্থায় খোলা বাজার বিক্রি কার্যক্রমে তেমন আটা বিক্রি হতে দেখা যায় না। তাতে স্বল্প আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হয় ঠিকই। এ অনিয়মের বিষয় মিল মালিকরা খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলেও তিনি অভিযুক্তদের শাস্তির বদলে যেভাবে 'আগেও আপনাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এসেছে। আমি আপনাদের আবারও সতর্ক করে দিলাম। বাকি চাকরিজীবনটা অন্তত ভালোভাবে থেকে মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বিদায় নেন।' এ ধরনের 'সতর্কতা' মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমরা মনে করি, এটা কেবল গুরু পাপে লঘু দণ্ডই নয় বরং এর মাধ্যমে তারা এ ধরনের গুরুতর অপরাধে উৎসাহিতও হতে পারেন। বিশেষ করে যখন একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এসেছে। এমনকি এর মধ্যে একজন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির মেয়াদ দু'বছর না হলেও ইতোমধ্যে গাইবান্ধায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ। এক পিওনের বিরুদ্ধেও এ রকম দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে অন্য শাখায় বদলি করা হয়েছে। এগুলো কোন ধরনের 'শাস্তি' আমরা জানি না। খাদ্য অধিদপ্তরের পুরোনো খাদ্যগুদাম মেরামত প্রকল্পের কাজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কমিশন বাণিজ্যের কারণে অচলাবস্থা তৈরি হলেও তিনি বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। অপরাধীদের এভাবে 'জামাই আদরে' রাখার কারণেই আমরা দেখছি খাদ্য অধিদপ্তরের কী দুর্দশা। আমরা মনে করি এ কারণেই অধিপ্তরের সর্বত্র অনিয়ম ও দুর্নীতি বাসা বেঁধে আছে। খাদ্য অধিদপ্তরের সর্বাঙ্গের ব্যথা সারানো অত্যন্ত জরুরি। তাতে যে ওষুধই প্রয়োজন, সেটাই দিতে হবে।

আরও পড়ুন

×