ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ওসমানী উদ্যান

রাজধানীর হৃৎপিণ্ডটা রাখুন

রাজধানীর হৃৎপিণ্ডটা রাখুন
×
×

রোববার রাজধানীর খামারবাড়ি পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীর ভিড়- সমকাল

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২০ | ২১:০৮

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রশাসনিক সদর দপ্তর সচিবালয় ঘিরে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যে 'পরিকল্পনা' রোববার সমকালে প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের কাছে কোনো বিবেচনাতেই সুপরিকল্পিত মনে হয় না। সচিবালয়ে যে গাড়ির ভিড় এবং সেগুলো পার্কিংয়ের যে অব্যবস্থাপনা, তা আমরা অস্বীকার করি না। কেবল সচিবালয়ের প্রয়োজন বলে নয়; যান ও জনবহুল একটি মহানগরীতে গাড়ি পার্কিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু তাই বলে ওসমানী উদ্যানেই সেই স্থাপনা গড়তে হবে কেন? এই মহানগরীতে এমনিতেই উন্মুক্ত এলাকা কমে যাচ্ছে। মুক্তবায়ু সেবনের সুযোগ আরও কম। একসময় নদী, খাল, পুকুর, মাঠ, উদ্যানে সুশোভিত এই নগরে এমনিতেই সবুজ কমে যাচ্ছে। অনেক খাল দখল হওয়ার পর, অনেক নদী হারিয়ে যাওয়ার পর, অনেক পুকুর ভরাট হওয়ার পর, অনেক উদ্যান উজাড় হওয়ার পর; যে সামান্য কয়েকটি সবুজঢাকা এলাকা এখনও কোনোরকমে টিকে রয়েছে, ওসমানী উদ্যান তার একটি। আমরা জানি, উদ্যান ও জলাশয় যে কোনো নগর ব্যবস্থারই হৃৎপিণ্ড বিবেচিত। অন্যদিকে, গাড়ি-ঘোড়া ও কংক্রিটের বাড়বাড়ন্ত মানে নির্মল বায়ু ও নান্দনিক পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ। এখন যদি আমাদের সবুজ হৃৎপিণ্ডগুলো ক্রমেই পরিবেশ দূষণকারী গাড়ির স্বার্থে বলী হতে থাকে, তাহলে এমনিতেই ধুঁকতে থাকা এই নগরী বাঁচবে কীভাবে? এই প্রশ্নও বড় হয়ে দাঁড়ায় যে, বারবার ওসমানী উদ্যানই কেন উচ্ছেদের মুখে পড়ে?

আমাদের মনে আছে, নিছক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ১৯৯৯ সালে এই উদ্যানের ১১ হাজার গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সাহিত্যিক, রাজনীতিকসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের দৃঢ় ও লাগাতার আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত উদ্যানটি রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু ওই সরকারের পালাবদলের পর আরেক সরকারের সময়ও কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই উদ্যানের শতাধিক গাছ কেটে ফেলার মতো অবিমৃষ্যকারিতা দেখেছিলাম আমরা। এখন আবার ওসমানী উদ্যান যদি গাছের বদলে গাড়ির দখলে যায়, তাহলে তা হবে যেমন হতাশাজনক, তেমনই বিক্ষোভ-জাগানিয়া। আমাদের প্রশ্ন, সরকারের নগর পরিকল্পনাকারীরা কি তাহলে আধুনিক ও স্বাস্থ্যকর নগর ব্যবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন? নাকি সংশ্নিষ্টরা ব্যক্তিগতভাবেই পরিবেশ ও নিসর্গের প্রতি অসংবেদনশীল? আমরা জানি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশের নদী, বন, সবুজ ও প্রকৃতি রক্ষায় কতটা আন্তরিক ও উদ্যোগী।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেছেন পরিবেশের নোবেলখ্যাত 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ' পুরস্কার। তারই সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওসমানী উদ্যানে গাড়ি পার্কিং স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে দেবে- সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনের এমন তথ্য আমাদের জন্য বিশ্বাস করা কঠিন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এই প্রস্তাব বা পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত হালে পানি পাবে না। কেবল নিসর্গ ও নগর রক্ষার প্রশ্ন নয়; বিদ্যমান সচিবালয় ঘিরে গাড়ি পার্কিং স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনায় দূরদর্শিতারও অভাব স্পষ্ট। সরকার যখন বর্তমান সচিবালয়কে আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা কয়েক বছর ধরেই করছে, তখন পুরোনো এলাকায় পার্কিং স্থাপনা নির্মাণের অপচয় কেন? আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, ওসমানী উদ্যান সংস্কারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বড় প্রকল্প এখনও চলমান। সেই প্রকল্প শেষ হতে না হতেই আরেকটি প্রকল্পের 'ঝনঝনানি' কেন? আমাদের এ আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থ নয়ছয় করতেই এক-একটি চক্র ওসমানী উদ্যান নিয়ে নতুন নতুন প্রকল্প 'বাস্তবায়ন' করতে চায়। আমরা দেখতে চাই, উদ্যানটি ঘিরে এ ধরনের পরিবেশবিরোধী চিন্তা ও তৎপরতা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বরং এর যেসব জায়গা ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধারে মনোনিবেশ করা হয়েছে। উদ্যানটিতে সুষ্ঠু ও সুনির্মল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বিনষ্ট হওয়া উদ্ভিদগুলোও পুনঃস্থাপনের বিকল্প নেই। রাজধানীর অন্যতম হৃৎপিণ্ডটি সুরক্ষিত রাখতেই হবে। আমরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আরও পড়ুন

×