ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

জন্মদিন

প্রিয় লেখকের প্রতিকৃতি

প্রিয় লেখকের প্রতিকৃতি
×

রাবেয়া খাতুন (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫)

আমীরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:২১

রাবেয়া খাতুন এবার ৮৫ বছরে পদার্পণ করলেন। আজ তার জন্মদিন। ৬০ বছরেরও অধিককাল তিনি নিবিষ্টচিত্তে, একাগ্র সাধনায় একলব্যের মতো বৈদিক-প্রেরণায় সাহিত্য রচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলা ভাষার খুব কম লেখকই এত দীর্ঘকাল সাহিত্য রচনার সুযোগ পেয়েছেন।

মুসলিম সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে জন্মগ্রহণ করেও রাবেয়া খাতুন কী করে আলোর ঠিকানা সন্ধান করলেন- এ বড় বিস্ময় আমার কাছে। কে তাকে স্বশিক্ষিত করল? কে প্রেরণা জোগাল? বড় লেখক হওয়ার গুণাবলি তিনি কী করে অর্জন করলেন? এসব প্রশ্ন জাগে আমার মনে। প্রকৃত অর্থে মুসলিম নারীদের মধ্যে বলিষ্ঠ ও সর্বার্থে সুসাহিত্যিকের বড় অভাব। কবিতায় সুফিয়া কামাল কিংবা গদ্য-প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া কিংবা সাংবাদিকতায় নূরজাহান বেগম, পরের প্রজন্মের সেই শক্তিমান শিল্পী কোথায়? মুসলিম নারী লেখকদের কথা একেবারেই হাতে গোনা যায়। কিন্তু কথাসাহিত্যিক একেবারেই দুর্লভ। গল্প-উপন্যাস পরিশ্রমসাপেক্ষ রচনা। রাবেয়া খাতুন সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন একাকী। ঠিক মহিলা হিসেবে তিনি কখনও বিবেচিত হননি। মহিলা লেখকদের কাতারেও তার নাম উচ্চারণ হয়নি কখনও। নারী লেখক হিসেবে বিভাজনের সীমানা তৈরি করেননি। তার লেখক জীবনের সূচনা পর্বেই সহযাত্রী ছিলেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, কাইয়ুম চৌধুরী, মির্জা আবদুল হাই, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান প্রমুখ যশস্বী ও কীর্তিমান লেখক। বাঙালি মহিলাদের হাতে সাহিত্য যেমন নারীর লালিত্য ও রমণীয়তা গুণে অসাহিত্য হয়ে ওঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কিন্তু রাবেয়া খাতুন ৫০ বছর আগে থেকেই ছিলেন চ্যালেঞ্জিং। নারী নন, একজন প্রকৃত লেখক হিসেবেই তিনি স্থায়ী আসন লাভ করেছেন বাংলা সাহিত্যে। রাবেয়া খাতুনের রচনাকর্মের মধ্যে কোনো মেয়েলিপনা নেই- এটি এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। এই ধারায় পরে আমরা পেয়েছি রিজিয়া রহমান কিংবা সেলিনা হোসেনকে। রাজিয়া খানের কথাও আমি স্মরণ করছি।

রাবেয়া খাতুনের বিপুল, অজস্র, বহুমুখী রচনাসম্ভারের সামনে দাঁড়ালে বিস্মিত হতে হয়। ক্লান্তিহীন, নিরন্তর তিনি সৃষ্টি সাধনায় মগ্ন থেকেছেন। শুনেছি, প্রতিদিন তিনি অফিস করার মতো রুটিন বেঁধে লেখার কাজ করে থাকেন। এই নিষ্ঠা বাঙালি লেখকদের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। আর আমাদের দেশে লেখকরা যত না ব্যস্ত লেখায় তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টায়। মোহহীন সাধক প্রকৃতির লেখকরা এই সমাজে দুর্লভ হয়ে উঠছেন। রাবেয়া খাতুনকে দেখলে তাই শ্রদ্ধায় নত হয়ে যাই। আপন ঘোরে, নিজস্ব বলয়ে বৃত্তাবদ্ধ অসাধারণ এই লেখক এখনও আধুনিকতম সৃজনশীলতায় নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। প্রতি বছর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বছরের উল্লেখযোগ্য দু-তিনটি উপন্যাস তিনি উপহার দিচ্ছেন আমাদের। এ নিয়ে তার কোনো অহংকার নেই। অনালোচিত থাকলেও তিনি বিচলিত নন। নিজের আনন্দময় জগতে নিজেই গুটিয়ে থাকেন এবং নিজের শক্তি সম্পর্কেও তিনি পূর্ণাঙ্গ কোনো ধারণা পোষণ করেন না।

দুর্ভাগ্য যে, রাবেয়া খাতুনের সাহিত্য নিয়ে আমাদের দেশে ভালো কোনো প্রবন্ধ রচিত হয়নি। তার রচনাগুলো বিস্তৃত গবেষণার অপেক্ষা রাখে। বহু বিচিত্র বিষয় নিয়ে উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন। আমাদের বিগত ৫০ বছরের রাজনীতি, গণমানুষ, মধ্যবিত্তের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধ, নারী-পুরুষ, ইতিহাস, দেশ ভাবনা, জনপদ- অসংখ্য প্রসঙ্গ তার রচনায় চিত্রায়িত হয়েছে। হয়তো কোনো গবেষক সেসব নিয়ে গবেষণা করবেন। তাতেও হয়তো রাবেয়া খাতুনের সঠিক মূল্যায়ন হবে না। ৩৮ বছর বয়সে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ধন্য হন। আমাদের দেশের সব বড় পুরস্কারই তিনি পেয়েছেন। এ বড় কম ব্যাপার নয়। রাবেয়া খাতুন জন্মগতভাবেই লেখক। হয়তো সে কারণেই আমাদের বেড়ে ওঠার সময় থেকে আমরা তার লেখার সঙ্গে পরিচিত।

রাবেয়া খাতুন অসম্ভব দরদি ও মমতাময়ী লেখিকা। তার মমতার উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে শিশুসাহিত্য। আশ্চর্য কুশলতা, সহজ-সরল-আড়ম্বরহীন ভাষায় রাবেয়া খাতুন তার চিরন্তন শিশুসাহিত্য লিখেছেন। দুঃসাহসিক অভিযান দিয়ে তার সূচনা। সুমন ও মিঠুর গল্প, একাত্তরের নিশান, লাল সবুজ পাথরের মানুষ, সোনা হলুদ পিরামিডের খোঁজে, রক্তমুখী শিলা পাহাড়, রোবটের চোখ নীল, সুখী রাজার গল্প, ঈশা খাঁ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা- এমন অসামান্য গ্রন্থ তিনি লিখেছেন। আমরা এসব বই পড়ে একদা মুগ্ধ হয়েছিলাম। বিচিত্র বিষয় নিয়ে তিনি ছোটদের জন্য লিখেছেন। জীবনী, ইতিহাস, সায়েন্স ফিকশন, ভ্রমণ, রূপকথা, সাধারণ জীবনের গল্প অনবদ্য ভাষায় লিখেছেন খালাম্মা।

আমরা ধারণা, কেবল ছোটদের জন্য লিখলেও খালাম্মা যশস্বী হতেন। বহুকিছু লিখেছেন বলেই তার শিশুসাহিত্য তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি। শুধু এককভাবে রাবেয়া খাতুনের বিস্তৃত শিশুসাহিত্য আলোচনার অপেক্ষা রাখে। আমরা তার ছোটদের লেখার দুর্দান্ত ভক্ত। দূর শৈশব থেকেই আমরা তার লেখা পড়ে আসছি। শিশু একাডেমির 'শিশু' পত্রিকায় সেসব লেখা পড়ে রোমাঞ্চিত হয়েছি। তখন ভাবতেও পারিনি, একদিন এই লেখকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হবে, সখ্য হবে। খালাম্মা আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করবেন এবং আমরা তার স্নেহরসে সিক্ত হবো।

শিশু সাহিত্যিক

আরও পড়ুন

×