ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

গ্যাসের মজুত হ্রাসমান

সময় হারাইলে সমাধান কঠিন

সময় হারাইলে সমাধান কঠিন
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়া সামগ্রিক সংকট বুঝিতে পারা দুরূহ। এখনও গৃহের চুলাটি জ্বলিতেছে বলিয়া গ্যাস লইয়া দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুধাবন করা যাইবে না। বাস্তবে সংকট ঘনীভূত। রবিবার সমকালে প্রকাশিত ‘গ্যাসের মজুত কমছে, বিকল্প সীমিত’ শীর্ষক প্রতিবেদনমতে, দেশে প্রতিদিন ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকিতেছে। বর্তমানের মজুত গ্যাস দিয়া বেশি হইলে আট বৎসর টানিয়া-টুনিয়া চলিবে। তন্মধ্যে দেশে ভাগ্যগুণে বৃহৎ কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হইলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আট বৎসর দৃশ্যত দীর্ঘ সময় মনে হইলেও গ্যাস উত্তোলন কিংবা আমদানি গ্যাসের প্রক্রিয়াজাতকরণে যেই অবকাঠামো প্রয়োজন, তাহা সময়সাপেক্ষ। সমুদ্রক্ষেত্রে গ্যাস থাকিলে সাধারণত পাঁচ হইতে ১০ বৎসর সময় ব্যয় হয় উহার শিখা দরশনে। ইহার পর উত্তোলনের ধাপ। আর পাওয়া সম্ভব না হইলে সকলই বিফল। উপরন্তু আমদানি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণে নির্মিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এসএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি হইলেও তাহা তৈয়ার করিতে কয়েক বৎসর প্রয়োজন। বর্তমান দুইটি এফএসআরইউ দৈনিক এক সহস্র মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিরাপদে প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতা থাকায় আপাতত এই সংকটে তিন হইতে চার বৎসরের মধ্যে সমাধানের সুযোগ নাই। 

প্রশ্ন হইল, এই দীর্ঘসূত্রতার আবর্তে দেশ পড়িল কী রূপে? মোটা দাগে বলিতে হয়, স্বনির্ভর হওয়া অপেক্ষা বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করিয়া আমদানি করিবার প্রবৃত্তিই এইখানে লইয়া গিয়াছে। নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান অপেক্ষা আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজির উপর অধিক নির্ভরশীল হইয়াছিলেন দেশের নীতিনির্ধারকগণ। বস্তুত ১৯৯৮ সালে বিবিয়ানার গ্যাসের সন্ধান পাইবার পর দেশে আর কোনো বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রের খোঁজ মিলে নাই। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে কুতুবদিয়া, জকিগঞ্জের গ্যাসক্ষেত্র হইতে উৎপাদন সম্ভব হয় নাই। একই কারণে ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনয়ন সম্ভবপর হয় নাই। ইহাও সত্য, এই অবকাঠামো খাতে যেই ব্যয় হইবে, তাহার সমান গ্যাস আনিতে না পারিলে ক্ষতির মুখে পড়িতে হইবে। 

দেশে বর্তমানে মোট গ্যাসক্ষেত্র ২০টি। গত জানুয়ারিতে মজুত ছিল ৬ দশমিক ৩২১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ছয় মাসের ব্যবধানে জুনে উহা দশমিক ৩২১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট কমিয়া বর্তমানে ৬ ট্রিলিয়ন ঘটনফুট হইয়াছে। এখন গ্যাসের মজুত হ্রাস, তৎসহিত উদ্বেগ বাড়িয়াছে দেশের সর্ববৃহৎ দুই গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা ও তিতাসের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায়। বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ আসিয়া থাকে আমদানিকৃত এলএনজি হইতে। উহাতেও বাড়িয়াছে ব্যয়। দেশের উপর আর্থিক চাপ বাড়িতেছে; সেই সঙ্গে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকির পরিমাণ। সহজ কথায়, দক্ষতার সহিত জ্বালানির ব্যবহার কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, উহা আমরা উপলব্ধি করিতে পারি নাই। কিন্তু এই গ্যাসের উপর নির্ভর করিতেছে দেশের অর্থনীতির চাকার গতি। গ্যাসক্ষেত্রের উপর নির্ভর করিয়া থাকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও কর্মসংস্থান। 

গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করিতে সরকার নূতন কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। পেট্রোবাংলার কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০টি এবং ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ১০০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারিত। বর্তমানে অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও সংস্কার মিলিয়া ৫০টি কূপের কাজ চলিলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও ধীর। স্থলভাগে কিছু কাজ অগ্রসর হইলেও দীর্ঘদিন সমুদ্রে কার্যকর কোনো অনুসন্ধান হয় নাই। স্বনির্ভর না হইয়া আমদানির উপর নির্ভরশীল হইবার মূল্য তো দিতেই হইবে আমাদের সকলকে। গ্যাস সংকট লইয়া দেশ এখন যেইখানে উপনীত, তাহাতে এখন স্বনির্ভর হইয়া সমাধান করিবার সুযোগ আর হাতে নাই। আকস্মিক কোনো বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হইলে ভিন্ন কথা। আপাতত এই সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হইল দ্রুত আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন। আর দীর্ঘ মেয়াদে সারাদেশে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের ‘আগ্রাসী’ উদ্যোগ গ্রহণেরও বিকল্প নাই।
 

আরও পড়ুন

×