বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের শিকার ৭৪% শিক্ষার্থী
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বনভোজনের কথা বলে নবীন ছাত্রীদের একটি কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে সিনিয়র ছাত্রীরা অহেতুক ধমক দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চতুষ্পদ প্রাণীর মতো ১০ ধরনের ডাক দিতে বলেন। ক্যাম্পাসে যাওয়া, ছেলেদের সঙ্গে মেশা ও ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো নিয়েও জেরা করা হয়। এক পর্যায়ে এক ছাত্রীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়; পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। গত ৮ অক্টোবর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
তবে র্যাগিং বা বুলিংয়ের এমন ঘটনা দেশের শিক্ষাঙ্গনে নতুন নয়। এর আগে ৪ জুলাই র্যাগিংয়ের অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১২ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা ৩ জুলাই রাতে কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে গালাগাল, কান ধরানো এবং ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে র্যাগিং ও মানসিক নির্যাতন করে।
দেশ-বিদেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৪ শতাংশ কখনও না কখনও র্যাগিং বা বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা ওই গবেষণায় পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেওয়া ৯ হাজার ৪৭৪ জনের মধ্যে ৭ হাজার ১১ জনেরই ছিল এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা। তাদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর মাত্রার র্যাগিংয়ের কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় এ ধরনের হয়রানির সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ এবং শিক্ষার্থীদের নিজস্ব মূল্যায়নে খারাপ শিক্ষাগত ফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের র্যাগিং: মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষাগত সাফল্যের ওপর প্রভাব’ শিরোনামের গবেষণাটি গত জুনে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশনের ২৪তম খণ্ডের তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এর অনলাইন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর। বাংলাদেশের ৫৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকরা।
গবেষণার শুরুতে ৯ হাজার ৫৭১টি উত্তর পাওয়া যায়। অসম্পূর্ণ ৯৭টি উত্তর বাদ দিয়ে বাকিদের তথ্য রাখা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৩ জন র্যাগিংয়ের শিকার হননি। তাদের বাদ দিয়ে ৭ হাজার ১১ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ইংরেজি ‘বুলিং’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে মৌখিক বিদ্রুপ, সামাজিকভাবে হেয় করা, শারীরিক ও অনলাইন হয়রানি এবং যৌন হয়রানির মতো আচরণ অন্তর্ভুক্ত।
নারীদের মধ্যে গুরুতর বুলিং বেশি
উত্তরদাতার মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৪ হাজার ৯৮৫ জন বা ৭১ দশমিক ১ শতাংশ। নারী ২ হাজার ২৬ জন বা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বুলিংয়ের মাত্রা অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ সামান্য, ৩৩ শতাংশ মৃদু, ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি এবং ১১ দশমিক ৯ শতাংশ গুরুতর বুলিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
পুরুষদের মধ্যে মাঝারি মাত্রার বুলিংয়ের শিকার ৫২ দশমিক ১ শতাংশ। গুরুতর মাত্রার অভিজ্ঞতা ৭ দশমিক ২ শতাংশের। নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ মৃদু মাত্রার বুলিংয়ের শিকার। তবে গুরুতর বুলিংয়ের হার নারীদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা পুরুষদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বেশি
জরিপে উত্তরদাতার মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৬৮৭ জন বা ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৩২৪ জন বা ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের উত্তরদাতাদের ১২ দশমিক ৩ শতাংশ গুরুতর বুলিংয়ের কথা জানিয়েছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ হার ২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে গবেষণার নমুনায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় পার্থক্য রয়েছে। তাই এ ফল দিয়ে দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানে র্যাগিংয়ের প্রকোপের বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
যৌন হয়রানির শিকার ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ
বুলিংয়ের ধরন বিষয়ে ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মৌখিক বিদ্রুপ বা টিজিংয়ের কথা জানিয়েছেন। সামাজিকভাবে হেয় করার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ। শারীরিক হয়রানি ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সাইবার বুলিংয়ের শিকার ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ। যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই উত্তরদাতা একাধিক ধরনের হয়রানির কথা জানাতে পেরেছেন। ফলে এসব শতাংশের যোগফল ১০০ হবে না।
বুলিংয়ের পেছনের কারণ হিসেবে উত্তরদাতার ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ উপহাস বা মজা করা এবং ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ প্রতিশোধের কথা জানিয়েছেন। চেহারা বা শারীরিক গঠনের কারণে হয়রানির কথা বলেছেন ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ধর্মের কারণে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হয়রানির কথা জানিয়েছেন।
বুলিংয়ের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা ছয় মাস ধরে এবং ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এক মাস ধরে বুলিংয়ের কথা বলেছেন ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এক থেকে দুই সপ্তাহের কথা জানিয়েছেন ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গ
গবেষণায় উদ্বেগের উপসর্গ পরিমাপে জিএডি-৭ এবং বিষণ্নতার উপসর্গ পরিমাপে পিএইচকিউ-৯ স্কেল ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্বেগের স্কোরে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশের মাত্রা মৃদু, ৪০ দশমিক ৯ শতাংশের মাঝারি এবং ১০ দশমিক ৬ শতাংশের গুরুতর ছিল। ৪ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের উপসর্গ পাওয়া যায়নি।
বিষণ্নতার স্কোরে ৪২ দশমিক ১ শতাংশের মাত্রা মাঝারি, ২৪ দশমিক ১ শতাংশের মৃদু এবং ২২ দশমিক ৮ শতাংশের মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ে ছিল। গুরুতর পর্যায়ের স্কোর ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশের। ১ দশমিক ৯ শতাংশের ক্ষেত্রে বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া যায়নি।
গবেষণায় র্যাগিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ফলাফল থেকে র্যাগিংকে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার একমাত্র কারণ বলা যায় না।
গুরুতর বুলিং ও খারাপ ফল
নিজেদের শিক্ষাগত ফল সম্পর্কে উত্তরদাতার ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন, তাদের ফল গড়পড়তা। ভালো ফলের কথা জানিয়েছেন ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং খারাপ ফলের কথা বলেছেন ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বুলিংয়ের তীব্রতা অনুযায়ী, গুরুতর মাত্রার অভিজ্ঞতা জানানো শিক্ষার্থীদের ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিজেদের শিক্ষাগত ফল খারাপ বলে জানিয়েছেন। মাঝারি মাত্রার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে এ হার ২৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং মৃদু মাত্রার ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
অভিযোগ নেই ৭৪ শতাংশের
র্যাগিংয়ের অভিজ্ঞতা জানানো ৭৩ দশমিক ৮১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেননি। অভিযোগ করেছেন ২৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। অভিযোগ না করার উচ্চ হার বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের ঘটনা জানানো ও প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।
কঠোর শাস্তির পক্ষে ৮১ শতাংশ
র্যাগিং প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে উত্তরদাতার মত নেওয়া হয় গবেষণায়। তাদের ৮১ দশমিক ২ শতাংশ সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। সচেতনতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন যথাক্রমে ৫৭ দশমিক ১ ও ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। ভুক্তভোগীকে যথাযথ সহায়তার কথা বলেছেন ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। অভিভাবক বা শিক্ষকদের জানানোর কথা বলেছেন ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
‘প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে’
গবেষণায় নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে গবেষক দলে ছিলেন রিফাত রায়হান রাফি, নাকিব ইসতিয়াক লাবিব, ফারহিন ইসলাম, রাজিয়া সুলতানা, মাহদি হাসান, অর্পা সিকদার ইতি, নাইমাতুন জান্নাত, কাওসার মাহমুদ নাবিন, আল আমিন, রেদোয়ান আহমেদ, তানজিম ইসলাম ও চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান।
ড. শাফায়াত হোসেন সমকালকে বলেন, র্যাগিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এতে র্যাগিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
কার্যকর নীতিমালা তৈরির জন্য র্যাগিংয়ের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং মৌখিক, সামাজিক, শারীরিক ও অনলাইন হয়রানি, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের আচরণকে এর আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ন্যায়সংগত তদন্তের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
- বিষয় :
- শিক্ষার্থী
- র্যাগিং