টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৫
সাফল্যের সঙ্গে ছিল কিছু অসংগতিও
ছবি-সংগৃহীত
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৩:২০ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:২৩
দশ দিনের এক অবিরাম উচ্ছ্বাস শেষে যখন টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের (টিআইএফএফ) পর্দা নামল, তখন মনে হলো শহরটার বুক থেকে যেন এক বিশাল নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। সেই আবহের ভেতরে দাঁড়িয়ে কিং স্ট্রিটের পথ ধরে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি মানুষই যেন অনুভব করেছে– সিনেমা কীভাবে কেবল পর্দায় নয়, মানুষের রক্তে, শ্বাসে, প্রতিদিনের জীবনে প্রবাহিত হতে পারে।
ডাউনটাউন টরন্টোর আকাশছোঁয়া কাচের ভবনগুলো এই কয়েক দিন যেন সিনেমার জন্যই বেঁচে ছিল। প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি চত্বরে মানুষের ভিড়; হাতে উৎসবের টিকিট, মুখে আলোচনার ঝলক। দিনের আলোয় ক্যাফেতে বসে যেমন চর্চায় ছিল নতুন সিনেমার প্রশংসা, তেমনি রাতের অন্ধকারে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে দর্শকের চোখে ছিল অশ্রু কিংবা উচ্ছ্বাসের ঝিলিক। সিনেমা যেন জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়ে পুরো শহরকে এক সঙ্গে ধ্বনিত করেছিল বিগত দশ দিন।
এবার ছিল উৎসবের ৫০তম বছর, তাই আড়ম্বরও ছিল বাড়তি। রেড কার্পেটের ঝলকানি যেমন ছিল, তেমনি থিয়েটারের ভেতরে দর্শকের দীর্ঘশ্বাস কিংবা হাততালিই ছিল আসল প্রাণ। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কী অপরিসীম আনন্দ নিয়ে হলঘরে প্রবেশ করেছেন। সিনেমার প্রতি মানুষের সেই নিবেদন সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। এখানেই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল উৎসবের স্লোগান– ‘গ্রেট অডিয়েন্স ডিজার্ভ গ্রেট সিনেমা’। সত্যিই, দর্শকের ভালোবাসা ছাড়া এমন উৎসব পূর্ণতা পেতে পারে না।
পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তগুলোও ছিল অনন্য। ‘হোমনেট’ যখন দর্শক জরিপে সেরা ছবির আসন পেয়েছে, হলভর্তি মানুষের উচ্ছ্বাসে বুক ভরে উঠেছিল। শেকসপিয়ারের পুত্রের জীবনের ওপর নির্মিত এই ছবির আবেগ যেন সরাসরি এসে ছুঁয়ে গিয়েছিল সবার হৃদয়। ‘নো আদার চয়েস’ তাঁর সাহসী বক্তব্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, আর কানাডিয়ান নির্মাণ ‘নিরভান্না দ্য ব্যান্ড দ্য শো দ্য মুভি’ প্রমাণ করল– নিজেদের গল্প দিয়ে কানাডিয়ান সিনেমাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সমানভাবে আলো ছড়াতে পারে।
শুধু পুরস্কারজয়ী ছবিই নয়, গোটা উৎসবই ছিল এক সাংস্কৃতিক স্রোত। সিনেমায় এখানে ছিল এশিয়ার নিপুণ বাস্তববাদ, ইউরোপের কাব্যিক নির্মাণ, লাতিন আমেরিকার প্রাণবন্ত গল্পগাথা। যেন এক বিশাল পৃথিবী একই ছাদের নিচে এসে মিলিত হয়েছে। সিনেমার ভাষা ভিন্ন, অথচ তার আবেগ সর্বজনীন– এই উপলব্ধি প্রতিটি প্রদর্শনীতে নতুন করে জন্ম নিয়েছে।
কানাডিয়ান সিনেমার জন্যও এ উৎসবের তাৎপর্য অপরিসীম। তরুণ নির্মাতাদের চোখে ছিল স্বপ্নের ঝিলিক। তাদের জন্য টিআইএফএফ কেবল একটি উৎসব নয়; বরং বিশ্বের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার সেতুবন্ধ। কানাডার চলচ্চিত্রশিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান দিতে এই উৎসবের অবদান নিঃসন্দেহে অনন্য।
মোট কথা, উৎসবটি কেবল কিছু ছবি দেখা নয়; বরং ছিল অনন্য এক অভিজ্ঞতা। আড়ম্বরের ঝলক, দর্শকের আবেগ, আলো-অন্ধকারের মিশ্রণ আর সিনেমার প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসা– সব মিলিয়ে এই উৎসব আগত সবাইকে বুঝিয়েছে, সিনেমা কেবল বিনোদন নয়; বরং মানুষের আত্মার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক অনিবার্য শক্তি।
ছিল কিছু অসংগতিও
উৎসব আলো-ঝলক ও সাফল্যে ভরপুর ছিল, তবু সমালোচনা থেকেও মুক্ত নয়। একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র– ‘দ্য রোড বিটুইন ইউএস: দ্য আলটিমেট রিসোর্স’ আইনি জটিলতার কারণে উৎসব থেকে বাদ পড়ে, পরে দর্শকের চাপে আবার তালিকায় ফেরে। এই ঘটনাকে অনেকে বলেছেন উৎসবের জন্য এক ধরনের “নৈতিক দ্বিধা”, যেখানে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়।
তা ছাড়া কিছু ছবির ব্যাপারেও সমালোচনা শোনা গেছে। যেমন: ব্যাড অ্যাপেলস শুরুতে আগ্রহ জাগালেও থিমের গভীরতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সিনেমা বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন। শক্তিশালী বিষয় নিয়ে কাজ করার চেষ্টা থাকলেও গল্পের টান ও চরিত্র বিকাশের ঘাটতি দর্শককে হতাশ করেছে।
- বিষয় :
- চলচ্চিত্র
- চলচ্চিত্র উৎসব
