ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেলা তার-এর ক্যামেরায় নোবেলজয়ী ক্রাসনাহোরকাইয়ের জগৎ 

বেলা তার-এর ক্যামেরায় নোবেলজয়ী ক্রাসনাহোরকাইয়ের জগৎ 
×

নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।

রহমান লেনিন

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৩৯

হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই– একই সঙ্গে সাহিত্যিক, দার্শনিক ও চিত্রনাট্যকার। তাঁকে অনেকে হাঙ্গেরির সমকালীন সাহিত্যের এক রহস্যময় সাধকও বলেন। তাঁর গদ্যে সময়, নৈরাশ্য ও মানবিক অস্তিত্বের সংকট মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বিষণ্ন মহাবিশ্ব।

৭১ বছর বয়সে সাহিত্যে সদ্য নোবেলজয়ী এই লেখক শুধু পাঠক নয়; বরং  চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর লেখার ভাষা যেমন গভীর ও দার্শনিক, তেমনি তাঁর গল্প ও চিত্রনাট্য ইউরোপীয় সিনেমায় এনেছে এক নতুন নীরবতার ভাষা।

ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্যিক সত্তা ও সিনেমাটিক দৃষ্টিভঙ্গি পরস্পরকে পরিপূরক করে। তিনি কেবল গল্প লেখেননি; বরং নিজের সাহিত্যিক ভাবনাকে রূপ দিয়েছেন চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষায়। তাঁর সাহিত্যিক মহাবিশ্বের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় হাঙ্গেরির কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা বেলা তার–এর শিল্পভুবনে। বেলা তার-এর প্রায় সব বিখ্যাত চলচ্চিত্রই গড়ে উঠেছে ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখা কাহিনি ও চিত্রনাট্যের ভিত্তিতে।
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘সাতানতাঙ্গো’ আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে   এক অনন্য মাইলফলক। সাত ঘণ্টা দীর্ঘ, সাদা-কালো এই চলচ্চিত্র যেন এক চলমান উপন্যাস। এক গ্রামীণ সমাজের পতন, প্রতারণা, হতাশা ও  বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে ফুটে ওঠেছে মানবিক নৈরাশ্যের মহাকাব্য। পরিচালক বেলা তার-এর স্থির ক্যামেরা, দীর্ঘ শট ও সাদা-কালোর ম্লান আলোকভুবন যেন ক্রাসনাহোরকাইয়ের গদ্যের প্রতিধ্বনি। ধীর গতি, নৈঃশব্দ্য এবং সময়ের পুনরাবৃত্তি এখানে হয়ে ওঠেছে এক ধরনের চলচ্চিত্র-ধ্যান, যা সাহিত্যিক ছন্দকে রূপ দেয় দৃশ্যের ভাষায়।

তাঁর আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মেলাঙ্কলি অব রেজিস্ট্যান্স’ অবলম্বনে ২০০০ সালে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ভার্কমেইস্টার হারমোনিজ’-এর কাহিনি সভ্যতার ভাঙন ও মানবিক পাগলামির এক নীরব রূপক। একটি ছোট শহরে বিশাল মৃত তিমির আগমন, আর তারপর থেকেই শুরু হয় ভয়, গুজব, উন্মাদনা ও সহিংসতার স্রোত। ক্রাসনাহোরকাই এখানে দেখিয়েছেন, মানুষ ভয়কে কীভাবে নিজের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র বানায়। এই সিনেমা কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক বক্তব্য নয়– এটি এক অস্তিত্ববাদী দৃশ্যভাষ্য, যেখানে সভ্যতার পতনের ধ্বনি শোনা যায় নীরবতার গভীরে। 

এই দুটি মহাকাব্যিক সিনেমার বাইরে ক্রাসনাহোরকাই চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা তার-এর আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন– ‘ড্যামনেশন’    (১৯৮৮), ‘দ্য ম্যান ফ্রম লন্ডন’ (২০০৭) এবং ‘দ্য টুরিন হর্স’ (২০১১)। এই সব চলচ্চিত্রেও ক্রাসনাহোরকাইয়ের দার্শনিক ভাবনা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।  

বিশেষত ২০১১ তে মুক্তি পাওয়া অসাধারণ চলচ্চিত্র ‘দ্য টুরিন হর্স’ পরিচালক বেলা তার ও লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের যৌথ সৃষ্ট এক মহাকাব্যিক ধ্যানচিত্র। নিটশের কিংবদন্তি ‘টুরিনের ঘোড়া’ ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এক বৃদ্ধ ও তাঁর ঘোড়ার নিঃসঙ্গ জীবনের মাধ্যমে ফুটে ওঠেছে সময়, ক্লান্তি ও অস্তিত্বের অবসান। ছয় দিনের পুনরাবৃত্ত নিত্যযাপন-বাতাস, অন্ধকার, ক্ষুধা-ক্রমে রূপ নেয় মহাবিশ্বের শেষ মুহূর্তের প্রতীকে। সংলাপনির্ভরতা নেই, আছে নীরবতা ও ধৈর্যের গভীর দর্শন। সাদা-কালো সিনেমাটোগ্রাফি ও মিনিমালিস্ট রিদমে এটি দেখায়–জীবন আসলে এক ধীর নিঃশেষ হওয়ার যাত্রা। এটি দর্শককে গল্প নয়; বরং দর্শককে সময় ও অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। আর নীরবতার মধ্য দিয়ে সময়ের প্রবাহকে অনুভব করায়। 

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের চিত্রনাট্যে গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সময়, আবহ এবং মানুষের নীরব প্রতিরোধ– যেখানে মানুষ লড়ছে এক অর্থহীন সময়ের বিরুদ্ধে।  বিশ্ব সমালোচকরা ক্রাসনাহোরকাইকে ‘স্লো সিনেমা’ ধারার অন্যতম দার্শনিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করেন। তাঁর সাহিত্য ও সিনেমায় কাহিনির চেয়ে প্রাধান্য পায় ধৈর্য, নৈঃশব্দ্য ও মানবিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। ফরাসি দার্শনিক জিল দেল্যুজ বলেছেন, “ক্রাসনাহোরকাই ও বেলা তার ইউরোপীয় সিনেমাকে নতুন এক দার্শনিক মাত্রা দিয়েছেন।” পশ্চিমা সমালোচকরা তাঁর তুলনা করেন দস্তয়েভস্কি ও কাফকার সঙ্গে। তবে সিনেমার পর্দায় তিনি আরও বিমূর্ত, আরও নিঃসঙ্গ।

যেভাবে সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাহিত্য ও চিন্তার সংলাপ তৈরি করেছিলেন, সেভাবেই ক্রাসনাহোরকাই বিশ্ব সিনেমায় দর্শন ও দৃশ্যের মিলন ঘটিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য ও সিনেমা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং দুটি আলাদা জানালা, যার মধ্য দিয়ে দেখা যায় একই মানবিক মহাবিশ্ব। 

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই তাই কেবল একজন নোবেলজয়ী লেখক নন– তিনি  সময়, শব্দ ও দৃশ্যের সংযোগে জন্ম নেওয়া এক নীরব বিপ্লব। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন সাহিত্যিক পর্দার আড়ালেও গল্পের জাদু ছড়াতে পারেন। তাঁর উপন্যাস যেমন পাঠককে ভাবতে শেখায় তেমনি তাঁর লেখা দৃশ্য আমাদের সময়ের সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু গভীর আর্তনাদ হয়ে থাকে। 
 

আরও পড়ুন

×