রিভিউ
দ্য নাইট ম্যানেজার: মানবিক সহায়তার আড়ালে অস্ত্রের ব্যবসা
‘দ্য নাইট ম্যানেজার’ সিরিজের অভিনয়শিল্পীরা। হিউ লরি (বাঁ থেকে), টম হিডলস্টন, এলিজাবেথ ডেবিকি, অলিভিয়া কোলম্যান ও টম হল্যান্ডার। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:২৮ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:২৮
কোনও এক সকালে হঠাৎ করেই কি পৃথিবীর যাবতীয় সংঘাত বন্ধ হয়ে যাবে? না। ব্রিটিশ লেখক জন লে কেরি অন্তত সেটি মনে করেন না। তাঁর এমন ভাবনার যুক্তি আছে ১৯৯৩ সালে প্রকাশ পাওয়া বই ‘দ্য নাইট ম্যানেজারে’।
বইটির অনুপ্রেরণায় ২০১৬ সালে নির্মিত হয় একই নামের টিভি সিরিজ। কেরির মতে, পৃথিবীতে যুদ্ধ কখনই শেষ হয়নি। এটি কেবল ভিন্ন উপায়ে ও ভিন্ন মানুষের মাধ্যমে এগিয়ে চলেছে। গ্যাংস্টারবাদের নতুন নাম হয়েছে বাজারভিত্তিক পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের নতুন নাম হয়েছে গ্যাংস্টারবাদ।
তাই টিভি সিরিজ ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’ কেবল একটি স্পাই থ্রিলার নয়; এটি জন লে কেরির চিরন্তন ধাঁচের এক আধুনিক রূপায়ণ। যেখানে নৈতিকতার ধূসর রেখাটি হয়ে উঠেছে গল্পের প্রধান চরিত্র। অপরদিকে অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় চোখ আটকে রাখার বাকি কাজ করেছেন টম হিডলস্টন, হিউ লরি ও অলিভিয়া কোলম্যান।
প্রায় ৯ বছর আগের সিরিজটি সম্প্রতি দ্বিতীয় দফায় দেখলাম। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বে চলমান সংঘাত ও এর চক্র বোঝার চেষ্টা করা। এখনো যারা দেখেননি তাদের কাছে এর গল্প সমসাময়িক মনে হতে পারে।
শুরু করা যাক
ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর মিশরের কায়রোর পাঁচ তারকা হোটেল নেফারতিতিতে রাত্রিকালীন ব্যবস্থাপকের কাজ করেন জোনাথন পাইন (টম হিডলস্টন)। এক সময় পরিচয় হয় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ফ্রেডি হামিদের প্রেমিকা সোফির সঙ্গে। ঘনিষ্ঠতার এক পর্যায়ে পাইন বড় অস্ত্র চুক্তির তথ্য পান। যেটির কেন্দ্রে আছেন রিচার্ড রোপার (হিউ লরি); মানবিক কার্যক্রমের আড়ালে অস্ত্রের মতো ধ্বংসাত্মক বাণিজ্যের মূলহোতা।
_1760689156.jpg)
চুক্তির তথ্য ফাঁসের পর হত্যা করা হয় সোফিকে। অল্প সময়ের প্রণয়ে জড়ানো পাইন এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে চান। ঘটনাচক্রে তাঁর পরিচয় হয় ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মী অ্যাঞ্জেলা বারের সঙ্গে। পাইন বুঝতে পারেন রোপারের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করতে তাঁকেও অন্ধকার জগতের সদস্য হতে হবে।
সিরিজের পটভূমি সুইজারল্যান্ডের আল্পস থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের বিলাসবহুল ইয়াট ও স্পেনের সমুদ্র তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে দেখার সময় দর্শক নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সাক্ষী হন। তবে একটু খুঁটিয়ে দেখলে পাইনের নাইট ম্যানেজার থেকে গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- সবকিছু এত দ্রুত কীভাবে ঘটতে পারে?
অস্ত্রের ব্যবসার আড়ালে মানবতা
‘দ্য নাইট ম্যানেজার’-এর শক্তিশালী দিক হলো এর মূল বিষয়বস্তু। যেখানে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার ভয়াবহতাকে মানবতার মোড়কে ঢেকে দেওয়া হয়। রিচার্ড রোপার তাঁর অবৈধ অস্ত্র বিক্রিকে বৈধতা দিতে এবং ব্যক্তিগত খ্যাতি রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও দাতব্য সংস্থা গড়ে তোলেন। তাঁর সংস্থা দেখায়, কীভাবে আধুনিক পুঁজি এবং ক্ষমতা দিয়ে অপরাধ লুকানো ও সমাজের সবচেয়ে সম্মানজনক মুখোশগুলো ব্যবহার করা যায়।
_1760689313.jpg)
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই বিষয়বস্তু বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জন লে কেরি দেখিয়েছেন, প্রকৃত ক্ষমতার খেলা শুধু অপরাধীদের মধ্যে নয়, বরং অপরাধীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের কিছু প্রভাবশালী মহলের গোপন আঁতাতের মাধ্যমে চলে। রোপার কেবল একজন দুর্বৃত্ত নন; তিনি এমন এক ব্যবস্থার ফল, যেখানে অর্থ, প্রভাবের বিনিময়ে নৈতিকতা বিক্রি হয়ে যায়।
সিরিজটি প্রশ্ন তোলে- একজন ‘মানবতার শত্রু’ কীভাবে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর নাকের ডগায় অবাধে বিচরণ করতে পারে? সিরিজটি আমার কাছে কেবল বিনোদন নয়, আধুনিক সমাজের এক তীক্ষ্ণ প্রতিচ্ছবি মনে হয়েছে।
অভিনয়, পরিচালনা, নির্মাণ
সিরিজের সাফল্যের মূল কারণ মনে হয়েছে টম হিডলস্টন ও হিউ লরির অভিনয়। পাইনের চরিত্রে হিডলস্টন শীতলতা, আকর্ষণ ও চাপা দুর্বলতার এক নিখুঁত মিশ্রণ। তাঁকেও ছাড়িয়ে গেছেন হিউ লরি। ঠান্ডা মাথার এমন এক ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যেটি গল্পের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। রূপক অর্থে দেখলে লরির মোহনীয় ভাবমূর্তি মানবতা আর বিচক্ষণতা ও সূক্ষ্ম চাহনি অস্ত্রের ভয়াবহতার প্রতিনিধিত্ব করে।
_1760689432.jpg)
সিরিজটি পরিচালনা করেছেন ডেনিশ পরিচালক সুসান বিয়ার। আর বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চিত্রনাট্য লিখেছেন ডেভিড ফার। সচরাচর বইয়ে কোনও গল্পের গাঁথুনি দিতে যতটা সময় লাগে পর্দায় সেটি করা হয়নি। ফলে কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত রিল, শর্টস দেখা চোখে এই গতি বরং টানটান উত্তেজনা তৈরি করে। সিরিজের বড় বাজেটও পর্দায় দৃশ্যমান। বিলাসবহুল হোটেল, ইয়াট ও একাধিক দেশে চিত্রায়ণের কারণে অস্ত্রের বৈশ্বিক বাণিজ্যের মতো সিরিজটিও আন্তর্জাতিক মানের প্রযোজনা হয়েছে। অনেকটা ‘জেমস বন্ড ০০৭’ এর মতো।
শেষ কথা
আজকের দর্শক, যারা কেবল দ্রুত অ্যাকশন নয় বরং একটি গল্পের নৈতিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক জটিলতা বুঝতে আগ্রহী, তাদের জন্য ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’ অপরিহার্য সিরিজ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের স্পাই থ্রিলার কেবল গুলির শব্দ আর তাড়া করে বেড়ানো নয়। বরং গভীর মানবিক সম্পর্কের, নৈতিক আপস ও একাকী প্রতিশোধের গল্প। যারা বুদ্ধিদীপ্ত থ্রিলার এবং উচ্চমানের টেলিভিশন প্রোডাকশন দেখতে পছন্দ করেন, তাদেরকে সিরিজটি সময়োপযোগী অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
- বিষয় :
- ওয়েব সিরিজ
- ওটিটি প্লাটফর্ম
- অ্যামাজন
