ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রিভিউ

সুপারবয়েজ অব মালেগাঁও: নেই ঘটনার ঘনঘটা, আছে বন্ধুত্বের দুঃখ-কথা

সুপারবয়েজ অব মালেগাঁও: নেই ঘটনার ঘনঘটা, আছে বন্ধুত্বের দুঃখ-কথা
×

সুপারবয়েজ অব মালেগাঁও সিনেমার একটি দৃশ্যে নাসির, আলীম, ফারুক, ইরফান, শফিক ও আকরাম। ছবি: প্রাইম ভিডিওর সৌজন্যে

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:৪২

‘সিরাজ ভাইকে বল, তোকে যেন মুম্বাই নিয়ে যায়।’- পাড়ার এক গলিতে আড্ডা দেওয়ার সময় একদিন নাসিরকে এ কথা বলে শফিক। দুজনের পরের কথোপকথন ছিল এ রকম- ‘আমরা মুম্বাই যেতে পারবো না। মুম্বাইকেই এখানে নিয়ে আসতে হবে’, ‘মানে! কী বলতে চাস’, ‘চল আমরা এখানেই সিনেমা বানাই’।

এক গলি থেকে আলাপ আরেক গলির চায়ের দোকানে যায়। যোগ দেয় আরও চার বন্ধু। পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক হয়। শেষমেশ তাঁতি, ফলের দোকানদার ও পেশায় বেকার ৬ বন্ধু সিদ্ধান্ত নেয়- সিনেমা বানাবেই। 

ভারতের মহারাষ্ট্রের ছোট শহর মালেগাঁওয়ের সত্য ঘটনা এটি। যা পর্দায় তুলে ধরেছেন রিমা কাগতি। ‘সুপারবয়েজ অব মালেগাঁও (২০২৪)’ নামের এই সিনেমা কেবল একদল তরুণের গল্প নয়; এটি সিনেমার প্রতি এক অনর্গল প্রেম, মানবিকতার নিঃশব্দ উদযাপন ও জীবনের কৌতুকময় সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

সিনেমার সেটে অভিনয় শিল্পীরা। ছবি: প্রাইম ভিডিওর সৌজন্যে 

মুসলমান অধ্যুষিত মালেগাঁওয়ের ধুলোমাখা পথ, চায়ের দোকান, সরু গলি, সিনেমা হল- আপনাকে নব্বইয়ের দশকের মফস্বলে নিয়ে যাবে। একই পাড়ায় একসঙ্গে বড় হওয়া ছয় বন্ধুর একজন নাসির শেখ (আদর্শ গৌরব)। আরও আছে শফিক, ফারুক, ইরফান, আকরাম ও আলীম। সবাই মিলে তৈরি করে নিজেদের ‘ফিল্ম ইউনিভার্স’। যেখানে বড় বাজেট নেই, আছে অগাধ আবেগ। শুরুতে তারা জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার প্যারোডি বানায়। এক সময় নিজেদের মতো করে স্বপ্নে রঙ দেয়। কিন্তু এই পথে বাধা হয়ে আসে- অভাব, সমাজের বিদ্রূপ আর কারিগরি সীমাবদ্ধতা। তবুও থামে না তারা। কারণ, তাদের কাছে সিনেমা মানে জীবনের সবচেয়ে বাস্তব স্বপ্ন।

এই সিনেমার আসল জাদু লুকিয়ে আছে চরিত্রগুলোর বন্ধুত্বে। নাসির আর তাঁর দল একে অপরের ভরসা, প্রেরণা ও সাহস। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কিন্তু তাদের আছে অক্লান্ত চেষ্টা আর অবিচল বিশ্বাস। পরিচালক রিমা কাগতি এই যাত্রাকে শুধু সিনেমা নির্মাণের গল্পে আটকে রাখেননি; বরং এটি হয়ে উঠেছে মানুষের সীমা অতিক্রমের এক মানবিক দলিল। 

সিনেমার আসল জাদু লুকিয়ে আছে চরিত্রগুলোর বন্ধুত্বে। ছবি: প্রাইম ভিডিওর সৌজন্যে

আদর্শ গৌরব নাসিরের চরিত্রে স্বপ্নবাজ কিন্তু দায়িত্বশীল এক নেতার ভূমিকা পালন করেছেন। মল্লিকা নামের এক তরুণীর সঙ্গে প্রেম ভেঙে গেলেও সিনেমা বানানো ছাড়েননি। এক সময় অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে এসে মল্লিকার শূন্যস্থান পূরণ করে সাবিনা (মুশকান জাফেরি)। সিনেমা নির্দেশনা ও সম্পাদনায় পটু হলেও নাসিরের ভেতর ঘাটতি ছিল মৌলিকত্বের। প্যারোডি বানিয়ে দর্শক হাসিয়ে সিনেমা হল হাউসফুল করাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ঠিক তখনই দ্বন্দ্ব তৈরি হয় বেকার বন্ধু ফারুকের সঙ্গে।

ফারুক স্বভাব কবি ও লেখক। গল্পের মৌলিকত্বে বিশ্বাসী। স্বপ্ন দেখে তাঁর লেখা এক সময় জাভেদ আখতারের (চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও কবি) নজরে পড়বে। কিন্তু নাসিরের বানানো নকল সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে নিজস্বতা হারাতে বসে। হতাশ আর বিরক্ত ফারুক এক সময় মালেগাঁও ছেড়ে মুম্বাই চলে যায়। এই চিড় ভাঙন ধরায় বাকিদের বন্ধুত্বেও। 

সিনেমাটি যেন মানুষের সীমা অতিক্রমের এক মানবিক দলিল। ছবি: প্রাইম ভিডিও

দেখতে দেখতে কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। অভিমানী বন্ধুরা আবার এক সঙ্গে মিলিত হয়। এই মিলনও ঘটে সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্যে। তবে এবার আর প্যারোডি নয়। মালেগাঁও শহরের ছয় বন্ধু মিলে এবার যে সিনেমা বানায় সেটিই তাঁদের প্রাণের গল্প। যে গল্প মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতার লাইন- ‘ছোটপ্রাণ, ছোটব্যথা ছোট ছোট দুঃখ-কথা নিতান্তই সহজ সরল/ সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি/ তারি দু’চারিটি অশ্রুজল। নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা/ নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ, অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে/ শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।’

বাস্তবের নাসির শেখ ও শফিক (বাঁয়ে)। সিনেমার দৃশ্যে শশাঙ্ক অরোরা ও আদর্শ গৌরব (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

মালেগাঁওয়ের ছয় বন্ধু দেখায়- একটা গল্প বলার ইচ্ছাটাই হলো সিনেমার প্রথম ক্যামেরা। ফারুকের ভাষায় এই গল্পের ‘লেখকই হলো আসল বস।’ আর নিরিহ ও চুপচাপ স্বভাবের শফিকের চরিত্র দেখায়- মৌলিক গল্প আশপাশেই থাকে। শুধু অন্তর দিয়ে খুঁজতে হয়। এই সিনেমাটি তাই তাদের জন্য- যারা স্বপ্ন দেখতে চায়, অনুপ্রেরণা খোঁজে বাস্তবজীবন থেকে।

সিনেমাটি দেখা যাবে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে।

আরও পড়ুন

×