ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

মাঠের নাটকীয়তা পর্দায়

ফুটবলভিত্তিক সাড়া জাগানো কিছু সিনেমা

ফুটবলভিত্তিক সাড়া জাগানো কিছু সিনেমা
×

ছবি-সংগৃহীত

মীর সামী

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ১৩:৫৪ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ১৪:১৬

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই ৯০ মিনিটের খেলা নয়–এটি আবেগ, স্বপ্ন, সংগ্রাম, রাজনীতি, পরিচয় এবং জীবনের গল্প। ফুটবল মাঠের এই নাটকীয়তা বহুবার ধরা পড়েছে সিনেমায়। বিশ্বকাপের এই সময় ফুটবলভিত্তিক কিছু অসাধারণ সিনেমা আবারও দেখা যেতে পারে...

গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস (রেটিং: ৬.৭)
২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে একজন দরিদ্র কিশোরের স্বপ্ন।
সান্তিয়াগো মুনিয়েজ একজন দরিদ্র মেক্সিকান-আমেরিকান তরুণ, যে লস অ্যাঞ্জেলেসে পরিবারসহ কঠিন জীবন কাটায়। তার বাবা চান সে স্থায়ী চাকরি করুক, কারণ তাদের জীবনে স্বপ্ন দেখার সুযোগ খুব সীমিত। তবুও সান্তিয়াগোর একটাই আবেগ। ফুটবল। সে ছোট ছোট মাঠে খেলতে খেলতেই নিজের প্রতিভা গড়ে তোলে।  একদিন ভাগ্য পরিবর্তন হয়, যখন একজন সাবেক ফুটবল স্কাউট তার খেলায় প্রতিভা খুঁজে পান। তিনি সান্তিয়াগোকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান, যেখানে সুযোগ হয় ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডে খেলার ট্রায়াল দেওয়ার। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি এবং কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে সান্তিয়াগোকে প্রমাণ করতে হয় সে শুধু স্বপ্নবাজ নয়, সত্যিকারের খেলোয়াড়। 

পেলে: বার্থ অব আ লেজেন্ড (রেটিং: ৭.১)
২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে কীভাবে সাও পাওলোর বস্তি থেকে বিশ্বকাপজয়ী নায়কে পরিণত হলেন। পেলের শৈশব থেকে শুরু করে ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে তাঁর ঐতিহাসিক উত্থান পর্যন্ত একটি নাটকীয় বর্ণনা। গল্প শুরু হয় সাও পাওলোর দরিদ্র বস্তিতে, যেখানে ছোট্ট পেলে বড় হন দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ আর কঠিন বাস্তবতার মধ্যে। তাঁর পরিবার বিশেষ করে বাবা, যিনি নিজেও একসময় ফুটবলার ছিলেন, পেলের ওপর বড় স্বপ্ন দেখেন কিন্তু জীবন-সংগ্রামের কারণে তা পূরণ করতে পারেননি। শৈশব থেকেই  ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর অস্বাভাবিক প্রতিভা। তিনি খালি পায়ে কখনও কাগজ বা কাপড় গুঁজে বানানো বল দিয়ে খেলতেন।

পেলে: বার্থ অব আ লেজেন্ড সিনেমার একটি দৃশ্যে

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পেলের স্বপ্ন বারবার বাধার মুখে পড়ে। পরে তিনি যোগ দেন সান্তোস ক্লাবে, যেখানে শুরুতে তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল এবং ‘অপরিপক্ব’ বলে মনে করা হয়। কোচিং স্টাফ তাঁকে নিয়ে সন্দিহান থাকেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর টেকনিক, গতি এবং সহজাত প্রবৃত্তি  সবাইকে অবাক করে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলে প্রথম দলে সুযোগ পান এবং সেখানে তিনি পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। তাঁর গোল, বিশেষ করে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেন এবং তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন তারকায় পরিণত করে।

শাওলিন সকার (৭.৩)
এই সিনেমার শুরু হয় এক ব্যর্থ কিন্তু স্বপ্নবাজ মানুষ সিংকে দিয়ে। শৈশবে তিনি ছিলেন শাওলিন কুংফুর একজন প্রতিভাবান শিষ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হারিয়ে ফেলেন নিজের পরিচয়। একদিন তাঁর দেখা হয় ফং নামের এক সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ফং প্রতিভাবান ছিলেন। দুর্নীতি ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। সিংয়ের মাথায় তখন এক অদ্ভুত ধারণা আসে। যদি শাওলিন কুংফুর শক্তিকে ফুটবলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সাধারণ মানুষকে আবার সেই হারানো শক্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই চিন্তা থেকেই শুরু হয় এক অসম্ভব দল গঠনের গল্প। সিং একে একে তাঁর পুরোনো শাওলিন ভাইদের খুঁজে বের করেন। কেউ এখন রুটি বিক্রি করেন, কেউ ময়দানে শ্রমিক, কেউ বা সমাজে একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গেছেন। কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ কুংফু ক্ষমতা। এই সিনেমাটি তাদের জন্য যারা খেলা এবং অ্যাকশন সিনেমা পছন্দ করেন। 

বেন্ড ইট লাইক বেকহাম (রেটিং: ৬.৭)
২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে একজন তরুণীর স্বপ্ন, পারিবারিক চাপ এবং সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেসমিন্ডার ‘জেস’ ভামরা একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় মেয়ে, যাঁর স্বপ্ন ফুটবলে পেশাদার হওয়া। জেস লুকিয়ে স্থানীয় একটি মেয়েদের ফুটবল দলে খেলতে শুরু করেন। সেখানে তাঁর দেখা হয় জুলস নামের আরেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব ও দলগত উন্নতি এগোতে থাকে, আর জেসের প্রতিভা চোখে পড়ে কোচদেরও। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন তাঁর পরিবার জানতে পারে তিনি ফুটবল খেলছেন। ধর্ম, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের স্বপ্নের সংঘর্ষ শুরু হয়। 

দিয়েগো ম্যারাডোনা (রেটিং: ৭.৭)

এই ডকুমেন্টারিটি নির্মাণ করেছেন আসিফ কাপাডিয়া, যিনি আর্কাইভ ফুটেজভিত্তিক বায়োপিক তৈরির জন্য পরিচিত। সিনেমাটি ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ও বিতর্কিত অধ্যায়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গল্পের ফোকাস মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে নাপোলিতে ম্যারাডোনার স্বর্ণযুগ, অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা। নাপোলিতে আসার পর ম্যারাডোনা একজন খেলোয়াড় নন, হয়ে ওঠেন এক প্রতীক হিসেবে। একই সময়ে তাঁর চারপাশে ঘনিয়ে আসে মাদক, মাফিয়া সংযোগ, মিডিয়ার চাপ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা। ধীরে ধীরে তাঁর ক্যারিয়ার যেমন উজ্জ্বল হয়, তেমনি ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে অস্থির ও নিয়ন্ত্রণহীন। ৫০০ ঘণ্টার বেশি আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করে এটি নির্মিত। এই সিনেমায় ম্যারাডোনাকে একজন দেবতুল্য ফুটবলারের পাশাপাশি ভাঙা একজন মানুষ হিসেবেও দেখানো হয়েছে।

মেসি (রেটিং: ৭.২)
এই সিনেমাটি প্রচলিত বায়োপিকের মতো শুধু গল্প বলার জন্য বানানো হয়নি; বরং এটি ডকুমেন্টারি, রি-এনেক্টমেন্ট এবং বিশ্লেষণমূলক সাক্ষাৎকারের মিশ্রণ। ফলে দর্শক একসঙ্গে বাস্তব ফুটেজ, নাট্যরূপ এবং বিশ্লেষণ–তিনটি স্তরে মেসির জীবন দেখতে পান। গল্প শুরু হয় রোসারিওতে মেসির শৈশব দিয়ে, যেখানে তিনি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি অসাধারণ আগ্রহ দেখান। তাঁর জীবনে বড় বাধা আসে তাঁর শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর ছিল, যা তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পরিবার তখন বড় ঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তাঁকে স্পেনে পাঠানোর। এরপর আসে বার্সেলোনায় তাঁর নতুন জীবন। লা মাসিয়া একাডেমিতে শুরুতে মেসি ছিলেন ছোট, শান্ত ও অনেকটা একা ধাঁচের ছেলে। ধীরে ধীরে তাঁর টেকনিক, ড্রিবলিং আর ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে তোলে। 

আরও পড়ুন

×