ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য

স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ১৫:৪৫

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সেবার সংকট কাটিয়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। 

বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠন টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। এ লক্ষ্য সামনে রেখে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, অতীতের সরকারগুলো স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলো রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।

ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ইউনিট
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে।

জেলা-উপজেলায় সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জটিল রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিতভাবে ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। অন্যদিকে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে সার্জারি, করোনারি কেয়ার ও কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রীভূত করা হবে। রোগী পরিবহনের সংকট কমাতে গড়ে তোলা হবে ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’।

পুষ্টি ও টিকাদানে জোর
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতি বা স্টান্টিং মোকাবিলায় সরকার বহুমাত্রিক জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। একই সঙ্গে একটি সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের কাজ চলছে।

বাজেট বক্তব্যে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রসঙ্গ তুলে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতে টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে।

ওষুধের কাঁচামাল শিল্পে গবেষণা ও বিনিয়োগ
অর্থমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে দেশের ওষুধশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) শিল্প পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা ও বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশব্যাপী আধুনিক ও টেকসই ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো যায়।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটাতে দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ নারী হবেন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাচেলর ও মাস্টার্স পর্যায়ে আসন বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

মেডিকেল শিক্ষায় নতুন কারিকুলাম
বাজেট বক্তব্যে অর্থ মন্ত্রী বলেন, চিকিৎসাশিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে নতুন দক্ষতাভিত্তিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রীয়করণ কমবে, প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা জোরদার হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হবে।
 

আরও পড়ুন

×