ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

সাক্ষাৎকার

শিল্পীর কখনও অবসর হয় না: সৈয়দ আব্দুল হাদী

শিল্পীর কখনও অবসর হয় না: সৈয়দ আব্দুল হাদী
×

সৈয়দ আব্দুল হাদী। ছবি:সংগৃহীত

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৪:০০

বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর ৮৭তম জন্মদিন আজ। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর কণ্ঠে প্রেম, দেশপ্রেম, প্রকৃতি ও মানবিকতার অসংখ্য গান উপহার দিয়েছেন। জন্মদিন উদযাপন, নিজের সংগীতজীবন, বর্তমান সময়ের গান ও অন্যান্য প্রসঙ্গে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন এই শিল্পী। 

দৈনিক সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা...
শুভেচ্ছার জন্য ধন্যবাদ। দোয়া করবেন আপনাদের ভালোবাসায় যেন সুস্থ থাকি।

বিশেষ দিনটি কীভাবে কাটাবেন বলে পরিকল্পনা করছেন?
অন্যসব দিনের মতোই আজকের দিনটি কাটবে। প্রতিবছরই শ্রোতা-ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হই। এবারও হয়তো তেমন কিছু হবে। জন্মদিনে মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার চেয়ে বড় উপহার আর কিছু হতে পারে না। দুপুরের দিকে চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেব। সানজিদা রহমানের উপস্থাপনায় তারকা কথন অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে থাকবেন গীতিকার রফিকুজ্জমান, শিল্পী মো. খুরশীদ আলম এবং আবিদা সুলতানা। ওই আয়োজনে আনন্দময় সময় পার করব বলো আশা করছি।

জন্মদিন এখন কেমন অনুভূতি নিয়ে আসে?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্মদিনের অনুভূতিও বদলে যায়। ছোটবেলায় জন্মদিন মানে ছিল আনন্দ। তবে শৈশবে জন্মদিনে ঘটা করে কোনো আয়োজন হতো না। এখন জন্মদিন মানে জীবনের পথচলার দিকে ফিরে তাকানো। মনে হয়, কত মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এত দূর এসেছি।

সম্প্রতি আপনার জীবন ও সংগীত নিয়ে ‘গল্প আছে এখানে...’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে; যেটি আজ প্রকাশ হবে...
খুব ভালো লেগেছে। কারণ সেখানে শুধু আমার গান নয়, আমার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, শিল্পচিন্তা এবং সময়ের কথাও উঠে এসেছে। একজন শিল্পীর জীবন শুধু মঞ্চ বা স্টুডিওতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ভেতরে অনেক স্মৃতি, সাধনা আর ত্যাগ থাকে। যদি নতুন প্রজন্ম সেই গল্প থেকে কিছু শেখে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমি থেকে বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন। এই স্বীকৃতিকে কীভাবে দেখেন?
যে কোনো সম্মানই শিল্পীর জন্য আনন্দের। দীর্ঘ সংগীতজীবনে নানা পুরস্কার পেয়েছি, কিন্তু মানুষ যে ভালোবেসেছে এবং শ্রদ্ধা করেছে, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। এই ভালোবাসার ঋণ কোনো দিন শোধ করা যায় না।

এখন তো আপনাকে নতুন গান কিংবা মঞ্চে খুব একটা দেখা যায় না। কেন?
করোনার পর শারীরিক কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগের মতো কণ্ঠও সাড়া দেয় না। তাই মনে হয়েছে, যা করেছি, সেটুকু সুন্দরভাবে থাক। আমি চাই না পুরোনো গানের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করতে। তবে শিল্পীর কখনও অবসর হয় না। পেশাদারভাবে গান ছেড়েছি, কিন্তু নিজের জন্য প্রতিদিনই গুনগুন করি। গান ছাড়া তো আমার জীবনই কল্পনা করা যায় না।

বর্তমান সময়ের গান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
এখন অনেক গান শুনে বোঝাই যায় না, কোনটা কার গান। সবাই যেন একই ধরনের সুর আর উপস্থাপনার দিকে চলে যাচ্ছে। অনেকেই গানকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার চেয়ে ভাইরাল করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। আগে বলেছিলাম, এখন গান বানানো হয় খাওয়ানোর জন্য। এখনও সেই কথাই বলব। তবে এর মধ্যেও ভালো কাজ হচ্ছে। যারা আন্তরিকভাবে শিল্পচর্চা করছে, তাদের কাজ অবশ্যই টিকে থাকবে।

নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
গানকে শুধু জনপ্রিয় হওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না। গানকে ভালোবাসতে হবে, শিখতে হবে, চর্চা করতে হবে। শিল্পে শর্টকাট বলে কিছু নেই। নিষ্ঠা, ধৈর্য আর সাধনা ছাড়া বড় শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। আমি চাই নতুন প্রজন্ম নিজেদের স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও পরিচয় তৈরি করুক।

অবসর কাটে কী করে?
বই পড়ি, টেলিভিশন দেখি, অন্য শিল্পীদের গান শুনি। প্রকৃতির কাছে থাকতে ভালো লাগে। বয়সের সঙ্গে একাকিত্ব আসে, কিন্তু সেই সময়টাকেও সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়। প্রত্যেক বয়সেরই নিজস্ব আনন্দ আছে। আনন্দ না থাকলে মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাও কমে যায়।

জীবনের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কোনো অপূর্ণতা কি এখনও অনুভব করেন?
অপূর্ণতা না থাকলে মানুষ নতুন কিছু করতে চায় না। সব শিল্পীর ভেতরেই একটি অতৃপ্তি থাকে। সেটিই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমার জীবনেও প্রাপ্তি আছে, অপ্রাপ্তিও আছে। তবে কখনও হিসাব করিনি কোনটা বেশি। আমি শুধু মানুষের ভালোবাসাকেই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখি।

আপনার গানে দেশপ্রেমের একটি শক্তিশালী ধারা সব সময়ই ছিল। আজকের বাংলাদেশকে নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আমি সবসময় বলি, আমরা যেন দেশকে ভালোবাসি। যার যার জায়গা থেকে দেশের জন্য কিছু করি। এই দেশ আমাদের সবার। আমরা যদি দায়িত্বশীল হই, তাহলে দেশও এগিয়ে যাবে। আমার দেশের মতো সুন্দর দেশ খুব কমই আছে।

জন্মদিনে ভক্ত-শ্রোতার জন্য আপনার কোনো বার্তা?
আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। এত বছর ধরে যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটিই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। বাংলা গানকে ভালোবাসুন, আমাদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসুন। আমি থাকব না একদিন, যদি আমার গান মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে, একজন শিল্পী হিসেবে সেটিই হবে আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

নিজের গাওয়া গান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে?
‘দ্যা লিজেন্ড সৈয়দ আব্দুল হাদী’ অ্যালবামের আরেক খণ্ড প্রকাশের ইচ্ছা ছিল। নানা কারণে সেটি আর হয়ে উঠেনি। এটা যে কতো কঠিন কাজ তা প্রথম খণ্ড প্রকাশ করতে গিয়ে বুঝেছি। গান বাজনা তো ছেড়েই দিয়েছি। গান নিয়ে নতুন করে আর কোনো পরিকল্পনা করতে চাই না।

আরও পড়ুন

×