একক নাটকে কেন বাড়ছে পারিবারিক গল্পের চাহিদা
ছবি-সংগৃহীত
ইলমা আজাদ
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১৪:১৫
একক নাটকের গল্প যেন কেবলই নায়ক-নায়িকানির্ভর। চরিত্রের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জীবনসংগ্রাম, প্রেম-বিরহ থেকে শুরু করে যে বিষয়ই তুলে আনা হোক না কেন, তা যেন নায়ক-নায়িকা ঘিরে আবর্তিত। তাই গুটিকয়েক চরিত্র দিয়ে শেষ হয় গল্প উপস্থাপন। তাই ঘুরেফিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, একক নাটকে কী পরিবারের গল্প দেখানো সম্ভব নয়? আড়াই-তিন বছর আগেও এমন প্রশ্ন শোনা গেছে অনেকের মুখে। সেই প্রশ্নকে শিল্পী ও নির্মাতা কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন বলা কঠিন। কিন্তু এও সত্যি যে, সময় বুঝিয়ে দিয়েছে, একক নাটকের গল্পে এক ধরনের শূন্যতা চলছে, যার পরিবর্তন অনিবার্য।
সেই উপলব্ধি থেকে নির্মাতারা মনোযোগী হয়ে উঠেছেন, একক নাটকেও পারিবারিক গল্প তুলে ধরতে। সেই সুবাদে একক নাটক নিয়ে দর্শকের ভাবনার জগৎ এখন বদলে যেতে শুরু করেছে। একক নাটকে প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে পারিবারিক গল্প। সেসব গল্প উপস্থাপনে শুধু নায়ক-নায়িকা নন, সমাবেশ ঘটছে সম্পর্কের সূত্রে বাঁধা অন্যান্য চরিত্রের; যা কয়েক বছর আগেও চোখে পড়েনি।
আশার কথা হলো, স্বল্প ব্যক্তির মাঝেও যে এক বা একাধিক পরিবারের গল্প আয়নাতে তুলে আনা যায়, তার প্রমাণও দিয়েছেন বেশ কিছু নির্মাতা। আশার কথা হলো, সেই চেষ্টায় নির্মাতারা সাফল্য পেয়েছেন। দর্শক মনোযোগ কাড়তেও খুব একটা সময় লাগেনি। এর প্রমাণ খুঁজতে খুব একটা পেছন ফিরেও তাকাতে হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে টিভি ও ইউটিউবে প্রকাশিত নাটকগুলোর দিকে নজর দিতেই বোঝা যায়, পারিবারিক গল্প নিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কেমন।
একক নাটকের গল্পের বুননে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্তর্দ্বন্দ্ব, অধিকার আদায়ে স্বার্থান্বেষী হয়ে ওঠা, ত্যাগ, বিসর্জন, করুণ পরিণতি, বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হওয়া থেকে শুরু করে নানারকম ঘটনা স্থান পেয়েছে, কখনও হাস্যরসের মিশেলে, কখনও বিষাদী ঘটনার সূত্র ধরে নয়তো অতীতের ফেলে আসা সময়ের সূত্র ধরে। যেমন ‘তোমাদের গল্প’ আমরা দেখি ভুল বোঝাবুঝির সূত্র ধরে পরিবারের সদস্যদের দূরে চলে যাওয়া এবং নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কে আবার জোড়া দিতে। দ্বিতীয় কিস্তি এবং এর পরের কিস্তি ‘তোমাদের গল্প-২’ নাটকে দেখা যায় দুই পরিবারের সন্তানদের প্রেম, বিয়ে এবং তা করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হতে। শুধু নিজ পরিবারের মানুষগুলোকে সুখী করতে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত থাকতে দেখা যায় প্রধান দুই চরিত্রকে।
‘কিছু কথা বাকি’ ও ‘ফ্যামিলি ম্যান’ নাটকে আমরা দেখি পরিবারের জন্য জীবনের সঙ্গে তুমুল লড়াই চালিয়ে যেতে। ‘পারিজাতের জন্য ভালোবাসা’ ও ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটকের মাধ্যমে বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে পরিবারের সদস্যদের যে মানসিক যাতনা এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হই আমরা। ‘এক মুঠো সুখ’ আমাদের মনে হাহাকার এনে দেয়, বেকার হয়ে পড়া যুবককে যাপিত জীবনের লড়াই নিয়ে। চাকরি হারানোর সত্যিটাকে গোপন করে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও বিয়েযোগ্য বোন ও অসুস্থ মাকে নিয়ে সেই যুবকের দিনযাপন দারুণভাবে মনে আঁচড় কাটে। ‘বোবা ভাষা’ নাটকে আমরা শুনতে পাই স্ত্রীর অতীত নিয়ে এক যুবকের আর্তচিৎকার।
অন্যদিকে ‘ভটভটি’ গল্পে যে পরিবার তাদের আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য মোটরসাইকেলের জন্য ছেলের বউকে নানাভাবে দোষারোপ করে, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই পরিবারের সদস্যদের মানসিকতার বদল ঘটে। ‘বেশি বলে বুলবুলি’ নাটকের দুই কিস্তিতে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের গল্পকে তুলে আনা হয়েছে। যেখানে ঘরের বউ তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে সবার কাছে বড় করে দেখাতে গিয়ে ক্রমাগত মিথ্যা বলে যায়; যার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটে নানা ঘটনা। আবার ‘ভালোবাসার গল্প’ নাটকে আমরা পাই এক অনাথ ছেলের আত্মত্যাগের কাহিনি।
অন্যদিকে ‘সন্ধ্যা ৭টা’ নাটকে এসেছে দুই গ্রামের মানুষের অন্তর্কলহের জেরে এক প্রেমিকের করুণ পরিণতি। ‘কসম’ নাটকে এসেছে এক মেয়ের প্রেমে প্রতারিত হওয়ায় সেই বাড়ির আশ্রিত ছেলে কীভাবে তার জন্য নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেয়। ‘নট এ লাভ স্টোরি’ আমাদের সামনে তুলে আনে এক নির্যাতিত নারীর আতঙ্কিত চেহারা। ভয়ংকর অতীত, যাকে তাঁর স্বামীর কাছে ভিড়তে ভয় পাইয়ে দেয়।
‘পানকৌড়ি’তে আমরা দেখি নিম্ন আয়ের এক যুবক কীভাবে এক ক্ষমতাবান পরিবারের সদস্যদের চিন্তাধারার বদল ঘটায়। একইভাবে ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘দ্য ফ্যামিলি’, ‘ঝরাপালক’, ‘প্রিয় পরিবার’, ‘হাফ বোতল’, ‘হিমি’, ‘সম্পর্কের গল্প’, ‘সুতরাং’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘বাড়ির ছোট ছেলে’, ‘ফিরে দেখা’, ‘প্রিয় নামে ডেকো’, ভালো থেকো’, ‘এলিয়েন বেবি’, ‘মন মঞ্জিল’, ‘হৃদয় গহিনে’, ‘কসম’, ‘ভিতর বাহিরে’ থেকে শুরু করে আরও অনেক একক নাটকে পারিবারিক সম্পর্কের গল্পগুলোয় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
এসব নাটকের সূত্র ধরে ফের পর্দার নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন আজিজুল হাকিম, দীপা খন্দকার, সমু চৌধুরী, খায়রুল আলম সবুজের মতো বেশকিছু নন্দিত অভিনয়শিল্পী। ব্যস্ততা বেড়েছে দিলারা জামান, শহীদুজ্জামান সেলিম, নাদের চৌধুরী, মাহমুদুল ইসলাম মিঠু, মাসুম বাশার, নরেশ ভূঁইয়া, মিলি বাসার, শিল্পী সরকার অপু, সাবেরী আলম, মনিরা মিঠু, ইন্তেখাব দিনার, রোজী সিদ্দিকীসহ অনেক পরীক্ষিত অভিনয়শিল্পীর। এক সময় বাবা-মা’র বাইরে অন্য কোনো চরিত্রে যাদের দেখা মেলেনি, এখন তারাও হরেকরকম চরিত্রে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন পারিবারিক গল্পের সুবাদে। যার মধ্য দিয়ে একক নাটকগুলোয় আরও বৈচিত্র্য এসেছে।
এ সময়ের আলোড়িত পারিবারিক গল্পের নাটকগুলোয় অভিনয় করে দর্শক মনোযোগ কেড়ে নেওয়া ফারহান আহমেদ জোভান, তৌসিফ মাহবুব, ইরফান সাজ্জাদ, ইয়াশ রোহান, তানজিম সাইয়ারা তটিনী, কেয়া পায়েল, নিলয় আলমগীর, জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি, মুশফিক আর ফারহান, পারশা ইভানা, খায়রুল বাসার, সাদিয়া আয়মান, আইশা খান থেকে শুরু করে প্রায় সব তারকার মতো, জীবনের প্রতিটি চলার পথ তৈরি হয় পরিবারকে ঘিরে। স্বপ্ন রচনা, সংগ্রাম, অপরাজেয় থাকার ইচ্ছা–এমন মানসিকতা গড়ে বেড়ে ওঠে পরিবার থেকে।
একই সঙ্গে অতীত ও ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরি, চাওয়া-পাওয়া আর আবেগী টানাপোড়েন নিয়ে পরিবারগুলোয় জন্ম নেয় নানা ঘটনা। সেসব গল্প এতদিন ধারাবাহিক নাটকে প্রাধান্য পেলেও এখন ধীরে ধীরে উঠে আসছে একক নাটকে; যা স্বল্প ব্যাপ্তির হওয়ায় দর্শকও নিজের পছন্দমতো সময়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণেই পারিবারিক গল্পের একক নাটকগুলো দর্শকের মাঝে এতটা সাড়া ফেলছে।
- বিষয় :
- নাটক