ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিস্তার

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিস্তার
×

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিস্তারের কারণ– দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, সীমিত জীবিকার সুযোগ, তরুণ জনগোষ্ঠীর হতাশা, অনিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন ব্যবহার।

মোহাম্মদ ছালেক উদ্দিন 

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১৫:২৬

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে বসবাসকারী মানুষের অধিকাংশই সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার শিকার। এমন বাস্তবতায় নিরাপত্তা, শিক্ষা, জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সংকটের পাশাপাশি আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ক্রমেই আলোচনায় উঠে আসছে– অনলাইন জুয়ার বিস্তার। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের জন্যও নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে। ফলে অনলাইন জুয়া এখন শুধু নৈতিক বা সামাজিক সমস্যা নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা, শিশু সুরক্ষা এবং মানবিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ১৮৬৭ সালের ঔপনিবেশিক জুয়া আইন ডিজিটাল যুগের অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬ পাস হয়েছে। যার লক্ষ্য অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং জুয়াসংক্রান্ত আর্থিক অপরাধ দমনে আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ে তোলা। নতুন আইনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, প্রচার, আর্থিক লেনদেন এবং সংঘবদ্ধ জুয়া কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো জটিল মানবিক প্রেক্ষাপটে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিস্তারের পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, সীমিত জীবিকার সুযোগ, তরুণ জনগোষ্ঠীর হতাশা, অনিয়ন্ত্রিত স্মার্টফোন ব্যবহার এবং ডিজিটাল সচেতনতার অভাব অপরাধ চক্রকে সুযোগ করে দেয়। সামাজিক মাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং অবৈধ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। শুরুতে সামান্য লাভের প্রলোভন দেখানো হলেও পরে অনেকেই ঋণ, প্রতারণা ও অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়ে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন জুয়া প্রায়ই বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, এটি অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। অর্থের প্রয়োজন, ঋণের চাপ বা অপরাধ চক্রের প্রভাব একজন ব্যক্তিকে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলতে পারে। জুয়ার জন্য অর্থের জোগান দিতে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে তাদের রেশনের খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছে, ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে শিশু পাচার, শোষণ ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে মানব পাচার, আর্থিক প্রতারণা, মাদক ব্যবসা কিংবা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো অপরাধ একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্তের বিষয়, কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য সরাসরি অনলাইন জুয়াকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে সংঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর বাস্তবসম্মত।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও গভীর। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু ও কিশোর মানসম্মত শিক্ষা এবং নিরাপদ বিনোদনের সীমিত সুযোগ পায়। এই পরিস্থিতিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়লে প্রতারণা, জুয়া বা অন্যান্য অনলাইন শোষণের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দিলে শিশুদের স্কুলচ্যুত হওয়া, শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়া বা পাচারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাই শিশু সুরক্ষা ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে এখন আর আলাদা বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। জুয়ার কারণে পরিবারে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে দাম্পত্য কলহ, মানসিক নির্যাতন কিংবা অন্যান্য পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। মানবিক সংকটপূর্ণ পরিবেশে এসব সমস্যা নারীদের জন্য আরও জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ফলে অনলাইন জুয়া প্রতিরোধের আলোচনায় নারী ও শিশু সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশ বা কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে দায়ী করা যায় না। অধিকাংশ রোহিঙ্গা পরিবার নিজেরাই সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্যের শিকার। তাই অপরাধ দমনের নামে কোনো জনগোষ্ঠীকে কলঙ্কিত না করে ব্যক্তি ও অপরাধ চক্রকে আইনের আওতায় আনাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আর্থিক লেনদেন ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ক্যাম্প প্রশাসন এবং মানবিক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, শিশু ও কিশোরদের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং ইতিবাচক বিনোদনের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। চতুর্থত, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সামাজিক সহায়তা, কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবার আওতায় আনতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আইন একা কখনোই সামাজিক সমস্যা সমাধান করতে পারে না। আইনের পাশাপাশি দরকার কার্যকর সামাজিক নীতি, সচেতনতা, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং অপরাধ প্রতিরোধে কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ। জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬ সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই আইনকে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে ডিজিটাল অপরাধ দমন যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি মানবিক সংকটে থাকা নিরীহ মানুষদের অধিকার ও মর্যাদাও সুরক্ষিত থাকে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে আইনের শাসন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিশু সুরক্ষাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার বিকল্প নেই।

মোহাম্মদ ছালেক উদ্দিন: শিশু সুরক্ষা সমাজকর্মী, রোহিঙ্গা শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম, সমাজ সেবা অধিদপ্তর

আরও পড়ুন

×