ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তরুণী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, সামনে আসে বীভৎস এক অপরাধ

তরুণী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, সামনে আসে বীভৎস এক অপরাধ
×

‘দায়রা’ সিনেমার পোস্টারে পৃথ্বীরাজ সুকুমারন ও কারিনা কাপুর

উপমা পারভীন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৪৪

এক তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। এরপর সামনে আসে বীভৎস এক অপরাধ। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে গোটা দেশ। চারদিকে সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, অপরাধীর শাস্তি চাই। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই সহজ সমীকরণগুলো জটিল হতে থাকে। অপরাধীর সন্ধানের পাশাপাশি সামনে আসে পুলিশ এনকাউন্টার, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজন এবং বিচারব্যবস্থার এমন কিছু প্রশ্ন, যার কোনো উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না।

এমনই এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দর্শককে দাঁড় করিয়েছে মেঘনা গুলজারের নতুন সিনেমা ‘দায়রা’।

অপরাধ, আইন, তদন্ত, নৈতিকতা এবং বিচারব্যবস্থার জটিল সমীকরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে এই ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। তবে ‘দায়রা’ কেবল একটি অপরাধের রহস্য উন্মোচনের গল্প নয়। অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে আইন ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার যে সংঘাত তৈরি হয়, সেটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে গল্পের মূল চালিকাশক্তি। 

‘দায়রা’ সিনেমার গল্পের শুরু একটি তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দিয়ে। পরে সামনে আসে বীভৎস এক ঘটনা; যা ছড়িয়ে পড়তে দেশজুড়ে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা। তদন্তের দায়িত্ব এসে পড়ে পুলিশের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডিপিসি আজুনি কোহলি ও ডিপিসি রমন কুমারের ওপর। দুজনেরই লক্ষ্য এক। সত্য খুঁজে বের করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা। সেই সত্যে পৌঁছানোর পথ নিয়ে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা।

কারিনা কাপুর খান অভিনীত আজুনি কোহলি একজন শান্ত, সংযত ও অভিজ্ঞ তদন্তকারী। আইনি প্রক্রিয়ার ওপর তাঁর আস্থা। তাঁর বিশ্বাস, অপরাধ যত ভয়াবহই হোক, একজন তদন্তকারীকে নিজের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কারণ আইনকে পাশ কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত নতুন অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের রমন কুমার অনেক বেশি কঠোর। ভয়াবহ অপরাধের জন্য দ্রুত ও কঠোর শাস্তির পক্ষপাতী তিনি। তাঁর কাছে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে শাস্তির মাত্রারও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। ফলে একই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আজুনি ও রমনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে। তদন্ত যত এগোয়, মামলাটি ততই জটিল হয়ে ওঠে। 

সামনে আসে একটি বিতর্কিত পুলিশ এনকাউন্টার এবং এক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজনের সম্পৃক্ততার বিষয়। তখন প্রশ্ন আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তার জন্য আইনের বিশেষ সুরক্ষা কি একইভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত? অপরাধের ভয়াবহতা কি বয়সের আইনি সীমাকে অতিক্রম করতে পারে? নাকি বিচারব্যবস্থার মূল নীতিই হলো–অপরাধ যত ভয়াবহ হোক, আইন সবার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে চলবে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুই পুলিশ কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। একজন মনে করেন, আইনই শেষ কথা। অন্যজনের কাছে অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে ন্যায়বিচারের তীব্রতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তদন্তের প্রতিটি ধাপ শুধু মামলার রহস্য উন্মোচন করে না, বরং দুই চরিত্রের বিশ্বাসকেও পরীক্ষা করে।’

দায়রা’র গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সম্ভবত এখানেই। সিনেমাটি দর্শককে সহজ কোনো উত্তর দেয় না। মামলার সঙ্গে যখন এনকাউন্টারের প্রসঙ্গ যুক্ত হয়, তখন সেই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সিনেমাটি নিয়ে এরই মধ্যে বলিউডের বেশ আলোচনা হচ্ছে। কারণ এই সিনেমার গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার একটা যোগসূত্র রয়েছে। শুরুতে ধারণা তৈরি হয়েছিল, ২০১৯ সালের হায়দরাবাদ গণধর্ষণ এবং পরবর্তী বিতর্কিত পুলিশ এনকাউন্টার হয়তো ‘দায়রা’র মূল অনুপ্রেরণা। তবে নির্মাতা মেঘনা গুলজার ভারতীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, সিনেমাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া একাধিক সত্য ঘটনা, অপরাধ এবং আইনি জটিলতার প্রভাব রয়েছে গল্পে।

ফলে ‘দায়রা’কে কোনো একটি ঘটনা বা মামলার পুনর্নির্মাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনার ভেতর থেকে উঠে আসা একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সিনেমাটিক অনুসন্ধান এটি। সেই প্রশ্ন হলো–একটি অপরাধের বিচার করতে গিয়ে রাষ্ট্র, আইন ও ব্যক্তির নৈতিক অবস্থান কোথায় গিয়ে মিলিত হয়? 

মেঘনা গুলজারের নির্মাণে বাস্তব ঘটনা, সামাজিক সংকট এবং ব্যক্তিমানুষের দ্বন্দ্ব এর আগেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

কারিনা কাপুর খান ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের চরিত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তাই কেবল দুই পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মতপার্থক্য নয়। এটি মূলত দুটি ভিন্ন বিচারদর্শনের সংঘাত। একদিকে প্রমাণ, আইন ও প্রক্রিয়া; অন্যদিকে দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং অপরাধের ভয়াবহতার প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। দুজনই নিজেদের অবস্থান থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চান।

ন্যায়ের পথ যে সবার কাছে এক নয়, সিনেমাটি সেই বাস্তবতা সামনে আনে। গল্প যত এগোয়, দর্শকের কাছেও হয়তো প্রশ্নটি বদলে যেতে থাকে। শুরুতে মনে হতে পারে, অপরাধীকে খুঁজে বের করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরে প্রশ্ন আসে অপরাধী কে, সেটিই কি একমাত্র বিষয়? নাকি তাকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়াটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ? উত্তরটি দর্শকের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন মেঘনা গুলজার।

আরও পড়ুন

×