ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সবাই এখন প্রযোজকদের হাতের পুতুল: আলমগীর

সবাই এখন প্রযোজকদের হাতের পুতুল: আলমগীর
×

আলমগীর- ছবি সমকাল

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ০১:০৯ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ | ০২:০৮

বরেণ্য অভিনেতা আলমগীর। প্রায় চার যুগ অভিনয়ের সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছেন। অভিনয়ের বাইরেও পরিচালক, প্রযোজক হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আসরে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন দাপুটে এই অভিনেতা। দীর্ঘ পথ-পরিক্রমা, অর্জন ও শিল্পীজীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে-

প্রায় চার দশক নিজেকে অভিনয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন। পেছন ফিরে তাকালে এই দীর্ঘ সফর কেমন মনে হয়?
কখনও অভিনেতা হবো- এমন ভাবনা ছিল না। কিন্তু ঘটনাক্রমে কীভাবে যেন সেটাই হয়ে গেল। কোনো মোহে নয়, একসময় অভিনয়কে আপন করে নিই। এখনও চেনা পথেই অবিরাম হাঁটছি। দেখতে দেখতে এত বছর পার হয়ে গেল, তা টেরই পেলাম না। এই বর্ণিল সময়ে অনেক মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি; যা আমায় এগিয়ে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি সাধারণ একজন শিল্পী। সাদামাটা মানুষ। তবে আমার ভাগ্য সবসময়ই সুপ্রসন্ন ছিল। প্রথম ছবি মুক্তির আগেই আমার হাতে ছয়-সাতটি ছবি এসেছিল। ভাবতাম, এগুলোর মধ্যে একটি ছবি তো হিট হবেই। এ কারণে নিজেকে সবসময়ই নিরাপদ মনে হতো। হলোও তাই। 'দস্যুরানী', 'অতিথি', 'লাভ ইন সিমলা'- সুপার ডুপার হিট। ওই সাফল্যের কারণে আমি আজ অভিনেতা আলমগীর। হাতে ছবি কম থাকলেও কোনোদিন ছবির জন্য নির্মাতার পেছনে দৌড়ায়নি। তাই ছবি আমার পেছনে ছুটেছে। এমনকি কোনো সিনেমা অফিসে গিয়ে ছবিতে স্বাক্ষর করিনি। সব মিলিয়ে আমার কোনো পিছুটান কিংবা টেনশনও ছিল না।

আপনি সবসময় প্রচারবিমুখ। এর পেছেনে বিশেষ কারণ রয়েছে কী?
আমি নীরবে কাজ করতে ভালোবসি। তাই মিডিয়ায় প্রচারের আলোয় আমাকে পাওয়া যায় না। মিডিয়া থেকে দূরে থাকি, তার মানে এই নয় যে, সাংবাদিকরা আমার শত্রু। একটা ভয় কাজ করে। আমার সম্পর্কে তারা বেশি বেশি লিখলে আমাকে নিয়ে জনগণের অনেক প্রত্যাশা তৈরি হবে। তাদের প্রত্যাশা যদি না পূরণ করতে পারি- সেই ভয়টা চিরকাল ছিল বলেই প্রচারবিমুখ থাকতে পছন্দ করি। যে জন্য সহসাই কোনো পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলে কোনো সাক্ষাৎকার দিতে চাই না।

সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। কখনও কি মনে হয়েছে, এ সম্মাননা আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল?
সে রকম কখনোই ভাবিনি। যে কোনো স্বীকৃতিই ভালো লাগে। পুরস্কারটি আনন্দ দিয়েছে। স্বীকৃতি পাওয়ার পর মনে হয়েছে, আরেকটু পরে হলেও চলত।

জুটির কথা উঠলে আলমগীর-শাবানার কথা প্রথমে ওঠে। এখন জুটি প্রথা হারিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে?
শাবানার সঙ্গে জুটি বেঁধে শতাধিক ছবি করেছি। শুটিংয়ে ক্যামেরা ওপেন হতো সকাল ৭টায়। মেকআপ নিতে হতো ৬টায়। আমরা যে জুটি হয়ে কাজ করছি, এটা আমাদের মাথায়ই ছিল না। জুটি কোনো শিল্পী তৈরি করতে পারে না। দর্শকদের তরফ থেকে আসতে হয়। একসময় রহমান-শবনম, রাজ্জাক-কবরীর নাম শুনলেই দর্শক হলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। দর্শক জাফর ইকবাল-ববিতা জুটিকেও বেশ গ্রহণ করেছিল। এখন জুটি হয়ে কাজ করা যায়, কিন্তু ধরে রাখা বিরাট ব্যাপার। কোনো জুটিকে এখন দর্শক সেভাবে চাইছে না বলেই জুটি প্রথা হারিয়ে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্রের এই সময়কে কেমন মনে হয়?
চলচ্চিত্র এখন সংকটকাল অতিক্রম করছে।  ভালো নির্মাতারও অভাব। সবাই প্রযোজকদের হাতের পুতুল। আমাদের সময় যে নির্মাতা ছিলেন তারা শিল্পীদের তৈরি করেছেন। জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, মোস্তাফা মাহমুদ, আলমগীর কুমকুম, সুভাষ দত্ত এখনও কাজ দিয়ে অমর হয়ে আছেন। শিল্পী তৈরি করতে পারে এ রকম নির্মাতা কি এখন আছে?। তাই ইন্ডাস্ট্র্রি মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে কতজন অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করছি। ফিল্মের উন্নয়ন করতে হলে কিছুটা ভর্তুকি সরকারকে দিতে হবে। এখান থেকে লাভ করতে হবে- সেটা ভাবা ভুল। এফডিসিতে যারা বসে আছেন তারা ফিল্মের 'এফ' পর্যন্ত বোঝেন না। এফডিসিতে অনেক ভালো ভালো মেশিন আছে। কিন্তু তা চালানোর লোকবল নেই। আজ থেকে অনেক বছর আগে একটি সাউন্ড সিস্টেম মেশিন এসেছিল। লোকের অভাবে সেই মেশিনটি ফিটই হয়নি। এখন ইঁদুরের বাসা। তারপর এসেছিল কালার কারেকশন মেশিন। সেটাও নষ্ট করে ফেলেছে। টেকনিক্যাল সাউন্ড বোঝার কর্মী এফডিসিতে নেই। দক্ষ লোকের অভাব।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে উপায় কী?
ইন্ডাস্ট্রি যে অবস্থায় যাচ্ছে, যদি এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে এর পরিণতি আরও খারাপ হবে। সময়োপযোগী কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমরা সবসময় আশার বাণী শুনি। বাস্তবায়ন ততটা পাচ্ছি না। বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে একটি কারণ হলো- অনেক বিষয়ের সমন্বয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এর একটি যদি আপনি না বোঝেন তাহলে চলচ্চিত্রের কোনো উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি শাখায় জ্ঞান থাকলে তখনই এর উন্নয়ন সম্ভব।

শুনলাম, নতুন ছবির পরিকল্পনা...
হ্যাঁ। ঠিকই শুনেছেন। ছবি বানাব। ভালো গল্পের সন্ধান করছি। একটা গল্প পেয়েছি, কিন্তু এর ব্যাপ্তি অনেক। দেখা যাক কী হয়।

জীবনে বড় পাওয়া কী?
একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি- এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে। আমরা ১৯৪৭-এর পরে স্বাধীন ছিলাম না। সেই দিনগুলো দেখেছি। আজ দেশ যদি স্বাধীন না হতো, আমি আলমগীর হতাম না। কোনো নায়কই নায়ক হতেন না। দেশ স্বাধীন না হলে এ দেশে বছরে ১২০টি ছবি হতো না। এই বাংলাদেশ জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। একটি স্বাধীন দেশ আমরা পেয়েছি, যেটা দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা তার কাছে আজীবনই কৃতজ্ঞ।

অনেকেই আপনাকে আইডল মনে করেন। আপনার আইডল কে?
উত্তম কুমারকে দেখে নায়ক হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তার ছবি একসময় প্রচুর দেখতাম। পাশাপাশি দীলিপ কুমারের বেশ ভক্ত ছিলাম। এই দু'জনের অভিনয় আমার খুব ভালো লাগত। তারপর যখন ফিল্মে কাজ শুরু করলাম, তখন রাজ্জাক ভাইকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতাম। আজীবনই তিনি শ্রদ্ধার আসনে থাকবেন।

জীবনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমি পজিটিভ একজন মানুষ। প্রতিদিন নতুন করে বাঁচি। গতকাল নিয়ে চিন্তা করি না। আগামীকাল নিয়েও ভাবি না।

আরও পড়ুন

×