সাহিত্যে নোবেল
ইয়োন ফস্সের ভুবন
ইয়োন ফস্সে [জন্ম : ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯]
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০
পাঁচ অক্টোবর বৃহস্পতিবার অবসন্ন বিকেলে যখন শোনা গেল নরওয়ের কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ইয়োন ফস্সেকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে তখন ফেসবুকে শত শত পোস্টে হতাশা ফুটে উঠেছিল। হতাশা এই কারণে নয় যে অনুপযুক্ত কোনো সাহিত্যিককে বেছে নিয়েছে সুইডিশ একাডেমি, বরং হতাশা এ কারণে যে ইয়োন ফস্সে ধরতে গেলে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি নাম। কোনো লাইব্রেরিতে না আছে তাঁর কোনো উপন্যাস বা নাটক, না তাঁর কোনো বই পাওয়া যায় কোনো বইয়ের দোকানে। বাংলাদেশের কোনো পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে কোনো প্রতিবেদন কখনও মুদ্রিত হয়নি।
আশা করা যায়, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সুবাদে এখন তাঁর বই বাংলাদেশে পাওয়া যাবে এবং তাঁর উপন্যাস ও নাটক বাংলা ভাষায় অনূদিত হবে। সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কারের ব্যাপারে বাঙালি পাঠকদের মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ রয়েছে তা খুবই ন্যায্য। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল সুইডিশ একাডেমি সেই ১৯১৩ সালে। সেকথা কখনোই বিস্মৃত হওয়ার মতো নয়। বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি। বলা হয়েছে, ইয়োন ফস্সে একজন ‘দুর্ধর্ষ লেখক’। এর কারণ তাঁর রচনার প্রাচুর্য। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস। ইতোমধ্যে ৪০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে এবং তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০ অতিক্রম করেছে। ২০১৯ থেকে শুরু করে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ করেছেন আত্মজৈবনিক ধাঁচের উপন্যাস ‘সেপ্টোলজি’, যার সর্বমোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩,৬০০।
‘সেপ্টোলজি’ তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে, যার প্রথম খণ্ডের নাম ‘দি আদার নেইম’। প্রথমে নরওয়ের ভাষায় এবং অব্যবহিত পরেই ইংরেজি এবং জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয় ‘সেপ্টোলজি’। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সমালোচকবৃন্দ উচ্চকণ্ঠে ‘সেপ্টোলজি’র প্রশংসা করেন। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে ইয়োন ফস্সে সারা পৃথিবীর এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক।
নাটকের মধ্যে থাকে ঘটনার দ্রুত চাল এবং উপাখ্যানের তীব্রতা। সেই পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে ইয়োন ফস্সে লিখতে বসেছিলেন একটি ধীর লয়ের গল্প। সেটি হতে পারত একটি উপন্যাসিকা বা বড়জোর একটি উপন্যাস। কিন্তু বেশি ভাবনা-চিন্তা করে লেখা তাঁর ধাত নয়। ফ্রান্সে গ্রীষ্মাবকাশে একদিন তিনি লিখতে শুরু করলেন। অবিশ্রাম চলতে থাকল এই লিখন। লিখতে লিখতে শেষাবধি ১৫ হাজার পাতার মহাগদ্য ‘সেপ্টোলজি’ লেখা হয়ে গেল। নিজের লিখন পদ্ধতি নিয়ে ইয়োন ফস্সে যা বলেছেন তা কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি বলেছেন, ‘লেখালিখি আমার জন্য একপ্রকার শ্রুতিলিখন। আমি বলতে পারব না আমি কী শুনছি কিন্তু আমি যে শুনছি এ কথা ঠিক। শুনছি বলেই তা লেখা হচ্ছে। লিখতে লিখতে কখনও মনে হয়, আমি যা লিখছি তা কোথায় যেন লিখিত হয়ে রয়েছে: উধাও হয়ে যাবার আগেই আমাকে কাগজে-কলমে ধরে ফেলতে হবে। অথবা কখনও মনে হয় টেক্সটা কোথাও আছে– আমার শুধু খুঁজে বার করা।’ এই বয়ান থেকে ইয়োন ফস্সের মধ্যে এক ধ্যানী সত্তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইয়োন ফস্সের লেখালেখি সম্পূর্ণ অন্তর্জাত, খুব স্বয়ংক্রিয়, একটি ঘটনা।
নিজের অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করেন না ইয়োন ফস্সে, বরং তাঁর অভিলক্ষ্য নিজ অভিজ্ঞতার বাইরে নতুন একটি জগৎ নির্মাণ করা; যার চরিত্রগুলি অচিন, আখ্যানভাগ অভূতপূর্ব। তিনি বলেছেন, ‘নিজেকে অভিব্যক্ত করা নয় বরং আমার অস্তিত্বকে অতিক্রম করে যেতে চাই আমি। আমার অভিজ্ঞতার আখ্যান উপন্যাসের অবয়বে নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।’
২. ইয়ন ফস্সের লেখকসত্তার সঙ্গে আমার পরিচয় আকস্মিক, কেননা আমি ওয়াটারস্টোনে গিয়েছিলাম আমার ছোট ছেলেকে বই কিনে দিতে। শনিবার বিকেলবেলার নিয়মিত কাজ ছিল ওটা। পড়ুক বা না-পড়ুক প্রতিবারই সে তিন-চারটি বই কিনে ফেলত। আমাকে বই বাছাই করে দিতে হতো না। সে ভালোই জানত দোতলার কোথায় থাকে ছোটদের বই। আমার দায়িত্ব ছিল বইয়ের দাম পরিশোধ করা। তার পড়ার ঘরে ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি হয়ে গিয়েছিল। ধুলো মুছে সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই ওই লাইব্রেরিতে একদিন আমি হাত দিয়েছিলাম। আর যে বইটিতে চোখ আটকে গিয়েছিল তার নাম ‘কান্ট’ (KANT)। সর্বনাশ, ইমানুয়েল কান্টের দর্শন নিয়ে লেখা বই! এরকমই ভেবেছিলাম আমি। একটু শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম। প্রাথমিক স্কুলের বাচ্চাদের জন্য দর্শনের বই? ভেতরে রঙিন ইলাস্ট্রেশন। হ্যাঁ, এখন মনে হয় ইয়ন ফস্সের পক্ষে তা সম্ভব। তিনি আট বছরের কিশোর ক্রিস্টোফারের গল্প বলেছেন। ঘুমোতে যাওয়ার আগে রাতে বিছানায় গা এলিয়ে ‘ডোনাল্ড ডাক’ পড়ে ক্রিস্টোফার। হঠাৎ করে দূর আকাশের কথা তার মনে চলে আসে। সে ভাবে ঐ আকাশের কি কোনো শেষ নেই? সীমানা নেই? যদি থাকে তবে কী আছে তার ওপারে? এ জগৎ কি একদিন শেষ হয়ে যাবে? সে কেবল টিকে থাকবে কোনো ঘুমন্ত দৈত্যের মাস্তিষ্কে? কী হবে যদি কোনো দিন জেগে ওঠে ঐ দৈত্য?–তার ছোট মাথায় এরকম নানা প্রশ্ন ভিড় জমায়। পাশের লাগোয়া ঘরে সে বাবার কাছে ছুটে যায়। বাবার হাতে ইমানুয়েল কান্টের বই। ধৈর্য নিয়ে তিনি ছেলের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করেন। ক্রিস্টোফারের মনে হয় সব প্রশ্নের উত্তর সে পাচ্ছে না। বাবা তখন ইমানুয়েল কান্টের কথা বলেন। কান্ট বলেছেন, আমাদের পক্ষে সবকিছু বুঝে ফেলা অসম্ভব। সব প্রশ্নের উত্তর হয় না। ক্রিস্টোফার ভাবে, হয় পৃথিবীর শেষ কোনো প্রান্ত আছে, অথবা পৃথিবীর শেষ বলে কিছু নেই।
৩. ইয়োন ফস্সের কাছে শিশুরা কেবল ‘ডোনাল্ড ডাক’ পড়া শিশু নয়। তারাও ইমানুয়েল কান্টের মতো দার্শনিক চিন্তায় প্রবিদ্ধ হয়। ছোটদের জন্য দার্শনিক বই লিখতে গিয়ে ইয়োন ফস্সে শিরোনাম দিয়েছেন কান্ট। কান্টের আলোচনা তেমন কিছু নেই। না থাকাটাই সমীচীন। তবে ইমানুয়েল কান্টের দর্শনোপলব্ধি ইয়োন ফস্সের লেখকসত্তার মধ্যে প্রতিফলিত। লেখক হিসেবে তিনি মুক্ত ও স্বাধীন, শক্তিশালী ও সাহসী। তাঁর মধ্যে কোনো প্রথানুগত্য নেই। কোনো প্রতিষ্ঠিত রচনাশৈলীর প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব নেই। কোনো আদর্শ বা মতবাদের প্রচারণা নেই। কোথাও নোঙর ফেলেননি তিনি। তাঁর উপন্যাস ‘বোটহাউজ’-এর শুরুতেই তাঁর স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য ভাস্বর হয়ে উঠেছে। এখানে দীর্ঘ উদ্ধৃতির বিকল্প নেই:
‘আমি আর বাইরে যাই না, এক অনির্বচনীয় অস্থিরতা আমাকে পেয়ে বসেছে এবং আমি আর বাইরে যাই না। এই গ্রীষ্মেই আমি অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়েছি। আবার নুটের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে, অন্তত বছর দশেক তার সঙ্গে মোলাকাত হয়নি। নুট এবং আমি আমরা সব সময় একত্রে চলেছি। একটা অস্থিরতা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আমি জানি না এটা কী। কিন্তু ওই অস্থিরতা আমার বাম বাহুতে, আমার আঙুলে বেদনার মতো ফুটে ওঠে। আমি আর বাইরে যাই না। জানি না কেন, কিন্তু শেষবার যখন দরজার বাইরে বেরিয়েছিলাম তারপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। কারণ এই অস্থিরতা। এজন্যেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি লিখতে বসব, লেখালেখি শুরু করব, আমি একটা উপন্যাস লিখে ফেলব। আমাকে কিছু একটা করতে হবে। এই অস্থিরতা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হয়তো লেখালেখি শুরু করলে কিছুটা উপশম হবে। কিছুটা স্বস্তি পাব। আবার দেখা হয়ে গেল নুটের সঙ্গে। সে বিয়ে করেছে, তার দুটি কন্যাসন্তান হয়েছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা সব সময় জোড়ে ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু নুট চলে গেল। আমি তাকে নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু নুট চলেই গেল। একটা অস্থিরতা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমি তার পৃষ্ঠদেশের দিকে তাকালাম। কী বলব আমি বুঝতে পারছিলাম না। কেবল দেখলাম রাস্তার ওপর নুট দাঁড়িয়ে আছে। এবং তারপর সে রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে অপসৃত হয়ে গেল। নুটের সঙ্গে তারপর আর কখনও দেখা হয়নি। আমার বন্ধু নুট, অন্তত দশ বছর তার সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ হয়নি এবং, তারপর আবার সে উদয় হলো এই গ্রীষ্মে। নুটের স্ত্রী। একটি হলুদ রেইন জ্যাকেট। ডেনিমের জ্যাকেট। তার চোখ দুটি। নুট সংগীতের শিক্ষক, ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছে। আমার বয়স তিরিশ পার হয়ে গেছে এবং জীবনে আমার কিছুই করা হয়নি। এখানে আমি মায়ের সঙ্গে থাকি। এই তো এই গ্রীষ্মেই একটা অস্থিরতা আমাকে ছেয়ে ফেলেছে। এর আগে আমি কোনো দিন কিছু লিখিনি, নিজের থেকে কোনো কিছুই না, তবে আমার ধারণা অধিকাংশ মানুষ চিঠি লেখে– এমনকি পদ্য রচনা করে, কিন্তু আমি কখনোই কিছু লিখিনি। হঠাৎ করে আমার মনে হলো আমি হয়তো লিখতে পারব। আমাকে কিছু একটা করতে হবে কারণ অস্থিরতাটা আমাকে গিলে খাচ্ছিল। খুবই আকস্মিকভাবে মনে হলো যে আমার লেখালেখি শুরু করা উচিত, সেটা ওই অস্থিরতায় আক্রান্ত হওয়ার পরে। কিছু একটা করতে হবে যাতে ওই অস্থিরতাটা ঠেলে সরিয়ে রাখা যায়। প্রকৃতপক্ষে লেখার সম্ভাব্যতা নিয়ে আমি কখনোই চিন্তা করিনি। এই অস্থিরতায় কবলিত হয়ে পড়ার পূর্ব পর্যন্ত। বারবার আমার ওপর আছড়ে পড়তে লাগল, ওই অস্থিরতা, বিশেষ করে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যাটা ছিল দিনের সেরা অংশ। আর এখন সন্ধ্যাটা অস্থির, পুরোপুরি টালমাটাল। আমাকে কিছু একটা করতে হবে, আর তাই আমি লেখালেখির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হয়তো তাতে উপকার হবে, হয়তো অস্থিরতাটা অবসিত হবে। আমি জানি না। কিন্তু যদি আমি লিখতে শুরু করি তাহলে ওই অস্থিরতাটা যেটা আমি ঝেড়ে ফেলতে পারছি না, সেটা হয়তো সহনীয় হয়ে উঠবে। তাতে হয়তো সবকিছু অন্যরকম হয়ে যাবে। সে যাই হোক না কেন, লেখালেখি করলে হয়তো অস্থিরতাটুকু কয়েক ঘণ্টার জন্য দমিয়ে রাখতে পারব। আমি জানি না। এই অস্থিরতা অসহ্য হয়ে উঠেছে, আর তাই আমি এই উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেছি।’
এ অংশটুকুর মধ্যে ইয়োন ফস্সের অনেক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়ে আছে। ক্রিস্টোফারের চিন্তার মধ্যে জগৎ বিনাশের ইঙ্গিত ছিল তা এখানেও আভাসিত। তাঁর স্বর অনুচ্চকিত। বাক্যের পারম্পর্য অনুপস্থিত। যতিচিহ্ন শৃঙ্খলাবিহীন। রচনা অপরিকল্পিত। পুনরাবৃত্তিতে আকীর্ণ। এমতরূপ ভাষাভঙ্গি পাঠকের কাছে অপরিচিত। নতুন। ‘বোটহাউজে’ ইয়োন ফস্সের যে বৈশিষ্ট্যাদি পরিদৃষ্ট হয়, তা আগেও ছিল, পরেও প্রত্যক্ষ হয়। কিন্তু যা বিশেষ করে উপলব্ধ হয় তা হচ্ছে একটি মানবসত্তার সপ্রাণ অস্তিত্ব। সে সত্তা নিমগ্ন চিত্তে লিখে যেতে থাকে। মনে হয় এই সত্তা ইয়োন ফস্সেরই প্রতিচ্ছবি। তা নয়। কারণ একেক উপন্যাসে এই মানবসত্তা উপস্থিত ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে। একদিকে জগৎ অনন্ত ও অসীম, অথচ মানবসত্তা পার্থিব চাহিদায় সীমাবদ্ধ। এই দুইয়ের বৈপরীত্য ইয়োন ফস্সের লেখকসত্তার অন্যতম চালিকাশক্তি বললে অন্যায্য হয় না।
৪. সময় নির্মম। সে কোন লেখককে স্থায়িত্ব দেবে আর কোন লেখক সহসা ডুবে যাবেন সময়ের তরঙ্গাভিঘাতে তার কোনো স্থির ব্যাকরণ নেই। তবে সমসাময়িকতার প্রলোভনকে অস্বীকার করে যিনি শাশ্বতকে আবিষ্কার ও ধারণ করতে সক্ষম, তারই রচনা টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এদিক দিয়ে ইয়োন ফস্সে সৌভাগ্যবান।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর অনন্যসাধারণ রচনাশৈলী, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাঁর রচনা ছন্দিত, সাঙ্গেতিকতায় ঋদ্ধ। ‘শৈশবের কিছু ছবি’ থেকে কিছু অংশ অনুবাদ করে দিয়েছেন অরিত্র আহমেদ, যা পড়া যেতে পারে:
[ক] আমার খুব খিদে লেগেছে। কাছে বাসের ভাড়া ছাড়া কোনো টাকা নেই। একটা ক্যাফেতে বসে আছি। একই টেবিলে বসে আছে অ্যাটলে, যাকে আমি নামমাত্র চিনি, আমার চেয়ে যে বছর কয়েকের বড়ো, আর লোকে বলে যে নাকি মদ্যপের এক শেষ। সে একটা হ্যামবার্গার কিনলো নিজের জন্য। আমার খুব খিদে লেগেছে। আমি কিছু বলিনি। কিন্তু অ্যাটলে জিজ্ঞেস করলো আমি হ্যামবার্গার খাওয়ার মেজাজে আছি কিনা, এবং উঠে গিয়ে আমার জন্যও একটা হ্যামবার্গার কিনে আনলো। আমি জানি আমার কাছে যা ছিলো, তার চেয়ে বেশি টাকা অ্যাটলে-র কাছে কোনোমতেই ছিলো না। কিন্তু এরপরও সে আমাকে হ্যামবার্গার কিনে খাওয়ালো। স্বাদ ছিলো অবিশ্বাস্য! [খ] অ্যাসলের মাথায় লম্বা, সুন্দর চুল আর একটা সুন্দর টুপি। আজ ১৭ মে, স্বাধীনতা দিবস। স্কুলের খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাসলে। কাছে তার মা-ও দাঁড়িয়ে। অচেনা এক মহিলাকে তার মায়ের দিকে হেঁটে যেতে দেখলো সে। এরপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে মহিলাটার সাথে মায়ের কথা বলাই দেখতে লাগলো। মহিলাটা সরে যাওয়ার পর অ্যাসলে-র মা তার দিকে এগিয়ে এসে বললো যে অচেনা এক মহিলা এসে তাকে জিজ্ঞেস করে গেলো, ওই নোংরা টুপি পরা লম্বা চুলের ছেলেটা কে? ‘তুমি কী বললে?’ অ্যাসলে জানতে চাইলো।
‘আমার ছেলে’, বললো তার মা।
[গ] এ এক হেমন্ত সন্ধ্যা। বাতাস, বৃষ্টি। সাপ্তাহিক ছুটিতে আমি বাড়িতে, সময় হয়েছে আমার ভাড়া-করা রুমে ফিরে যাওয়ার। একটা পুরোনো কাছারিঘরের চিলেকোঠায় থাকি এখন। রুমে ফিরে গিয়ে স্টোভে আগুন জ্বালবো, এরপর হয়তো একটু লেখালেখি করবো। বাবার দেওয়া একটা পুরোনো টাইপরাইটার আছে আমার। মাঝে মাঝে দেখা যায়, আমি বসে পড়ি, আর একটু লিখি। এখন আমি বাসের জন্য অপেক্ষারত কিছু তরুণের সাথে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়। রাস্তাটা অন্ধকার। বাতাস, বৃষ্টি। পাশ দিয়ে একটা গাড়ি চলে গেলো হয়তো। কানে আসছে জেটিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ। সেকেন্ডারি স্কুলে যাচ্ছি আমি। থাকি একটা ভাড়া-বাসায়। আমি ভীত। আমি লিখবো। আমি বাস থেকে আলো আসার অপেক্ষায় আছি।
- বিষয় :
- ইয়োন ফস্সের ভুবন
- সাহিত্যে নোবেল
