ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পড়ার ফাঁকে কাজ

পরিশ্রমে ভাগ্য বদল

পরিশ্রমে ভাগ্য বদল
×

পড়াশোনার পাশাপাশি তরুণরা এখন কল সেন্টার, ওয়েব ডেভেলপার কিংবা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে ছবি : জেমেনি এআই ন্যানো ব্যানানা

আলাউদ্দিন আলাদিন 

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৮ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আর্থিক অনটন; দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের চিরচেনা রূপ। আর্থিক টানাপোড়েনে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। এমনকি বন্ধ পর্যন্তও হয়ে যায়। অনেক মেধা আর সাফল্য দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। তবে তরুণরা ঘুরে দাঁড়াতেও জানে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে আর্থিক অনটন কাটিয়ে ওঠা দেশের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণের আত্মবিশ্বাসের গল্প তুলে ধরেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন 

ফাহমিদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। হলে থেকে পড়াশোনা করেন। মা-বাবা থাকেন গ্রামে। বাবা একসময় দেশের বাইরে থাকলেও বর্তমানে দেশে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাবার পাঠানো টাকায় ফাহমিদা পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছেন। তবে সব সময় তার  চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাঠাতে পারেন না বাবা। মাঝেমধ্যে ফাহমিদাকে অর্থকষ্টে পড়াশোনা করতে হয়। তাই পড়াশোনায় মনোযোগ বিঘ্নও ঘটে।

ঘটনা দুই 
শাহনেওয়াজ মধ্যবিত্ত ঘরে বেড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। বাবা অসুস্থ, তাই কর্মহীন। মা চাকরি করে সামান্য বেতনে আগলে রেখেছেন পরিবার। সাংসারিক টানাপোড়েনের মধ্যেও খুব কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছেন শাহনেওয়াজ। সামনেই সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। রয়েছে প্রেজেন্টেশন। কিছুদিন আগে জানলেন, বাধ্যতামূলক শিক্ষা সফরে যেতে হবে। সংসারের এই আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে কীভাবে সামলাবেন সব, চিন্তায় পড়ে যান।

সমাধানের সহজপাঠ
ওপরের ঘটনা দুটি বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের চিরচেনা রূপ। ফাহমিদা ও শাহনেওয়াজের মতো আর্থিক টানাপোড়েনে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। এমনকি বন্ধ পর্যন্তও হয়ে যায়। অনেক মেধা আর সাফল্য দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। তবে তরুণরা এও জানে যে, হতাশ হলে চলবে না। দুশ্চিন্তা আর হতাশা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে সব বাধা-বিপত্তি মোকাবিলা করার জন্য। কীভাবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়া যায় তা জানা গেল ফাওজিয়া, তাহমিদ, রওনক, সাইফান, দুরদানা, ইফতি আর মাহীরের কথায়। তারা জানালেন নিজেদের পথচলার গল্প। 

পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ
‘আমি মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, বাবা নেই, মা গৃহিণী। বাবার পেনশন আর বড় ভাইয়ের স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চলে। এর মাঝে আমার পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। মানসিক অস্থিরতায় দিন কাটাচ্ছিলাম। এতে পড়াশোনায় আমার বেশ বিঘ্ন ঘটে। আমারই এক বন্ধুর পরামর্শে পার্টটাইম জব খোঁজা শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় পাব। অনলাইন জব পোর্টালগুলোতে সিভি দেওয়া শুরু করলাম। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। চেষ্টা করতে করতে একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানির কল সেন্টারে পার্টটাইম জব পেয়ে গেলাম।’ কথাগুলো বলছিলেন রওনক। তিনি আরও জানান, ‘সপ্তাহে চার দিন জব করতে হয়। মাত্র ৫ ঘণ্টা করে। এর ফলে আমার পড়াশোনায় কোনোরকম বিঘ্ন ঘটে না। বরং আগের তুলনায় আমি বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠি। বাসায়ও কিছু  সহযোগিতা করতে পারছি। পরীক্ষা থাকলেও দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সহকর্মীর সঙ্গে পরীক্ষার সময় ডিউটি চেইঞ্জ করে নিই। ফলে অফিস এবং পড়ালেখা দুটোই সমান তালে চালিয়ে যেতে পারছি।’

মাহীরের সমস্যা অন্য কোথাও!
কথা হলো স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজমে পড়া মাহীরের সঙ্গে। মাহীর জানালেন তাঁর সমস্যা উত্তরণের পথের কথা। তিনি জানান, আমার সমস্যাটা ছিল একটু অন্যখানে। পড়াশোনার খরচ পরিবার কষ্ট করে চালিয়ে যেতে পারলেও আমার হাতখরচ চালিয়ে নিতে পারছিলাম না। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, পার্টি কিংবা বন্ধুদের বিয়ের দাওয়াত–এগুলো সামলানো খুবই কষ্টের হয়ে যাচ্ছিল। কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছিল। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি পড়াশোনায় শৈশব থেকেই বেশ মনোযোগী ছিলাম। বন্ধুরা বলত আমি নাকি বেশ ভালো পড়া বোঝাতে পারি। পরে একটা চিন্তা মাথায় চলে এলো, টিউশনি করলে কেমন হয়। টিউশনি শুরু করলাম। নিজের মতো করে সময় বের করে টিউশনি শুরু করে দিলাম। এর কিছুদিন পর একটা বিজ্ঞপ্তি দেখলাম পত্রিকায়, একটি কোচিং সেন্টারে পার্টটাইম লেকচারার প্রয়োজন, সিভি দিলাম। ব্যস হয়ে গেল। কোচিং সেন্টারে পড়াতে লাগলাম। নিজের পড়াশোনা চালাতেও কোনো সমস্যা হলো না। বরং আমার পড়াশোনা আরও বেড়ে গেল। হতাশাও কেটে গেল। আমি মনে করি পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক কিছুই করার আছে একজন শিক্ষার্থীর। এতে শুধু আর্থিক সমস্যারই সমাধান হয় না, ক্যারিয়ারেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।’

আফওয়ার্ক এবং ফ্রিল্যান্সার ডটকমের খোঁজ
তাহমিদ পড়াশোনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বাবা সরকারি চাকরি করেন। মা গৃহিণী। স্বল্প আয়ের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। পার্ট টাইম জব খুঁজলাম অনেক। অনেকে বলল, যেখানে পূর্ণ মেয়াদি জব পাওয়া যায় না, আর খণ্ডকালীন তো অসম্ভব। তারপরও হাল ছাড়িনি। চেষ্টা করে গেছি। প্রযুক্তির প্রতি আমার কিছুটা ঝোঁক ছিল। ইংরেজি একটু ভালোই পারতাম। বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ নিলাম। জানলাম আউটসোর্সিংয়ের কথা। স্বল্পমেয়াদি একটি কর্মশালায় নিজেকে প্রস্তুত করে কাজ শুরু করে দিলাম। আউটসোর্সিং সহায়ক প্রতিষ্ঠান আফওয়ার্ক এবং ফ্রিল্যান্সার ডটকমে কাজ শুরু করলাম। গ্রাফিক ডিজাইন এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্টের ওপর কাজ করতে লাগলাম। প্রথম অবস্থায় কিছুটা সময় দেওয়া লাগলেও পরে স্বল্প সময় দিয়েই আমি প্রতি মাসে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করা শুরু করলাম। এতে আমার কাজ এবং পড়াশোনার প্রতি আরও আগ্রহ বেড়ে গেল।’

যিনি নিজেই কিছু করতে চাইতেন
রওনক, মাহীর এবং তাহমিদের মতো দুরদানার সমস্যাটা কিন্তু আর্থিক নয়। ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী দুরদানা বলেন, ‘শিক্ষাজীবনে আর্থিক অনটনে কখনও পড়িনি আমি। তবে সব সময় চাইতাম কেবল পড়াশোনা নয়, পাশাপাশি কিছু একটা করতে। সেই ভাবনা থেকেই পার্টটাইম জব খোঁজা শুরু করি। কিছুদিন পরই একটি ফ্যাশন হাউসে সেলসম্যান হিসেবে নিয়োগ পাই। সপ্তাহে তিন দিন ৫ ঘণ্টা করে সময় দিই। ফলে আমার পড়াশোনা বা ইউনিভার্সিটির ক্লাস করতে কোনো সমস্যা হয় না। বরং মনে হচ্ছে পড়াশোনাও করছি আবার অবসর সঠিক কাজে ব্যবহার করছি।’ 

তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক যুগে...
দেশের যে কোনো প্রান্তের তরুণরা এখন আর্থিক  দৈন্যকে উদাহরণ বানিয়ে পড়াশোনায় ইতি টানতে নারাজ; আপনি কেন সেই পথে হাঁটবেন? পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এখন কেবল আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং চারপাশে নজর রাখতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক যুগে বৈধ বিভিন্ন জীবিকার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন সম্ভব। পড়াশোনায় ক্ষতি নয়, বরং স্বল্প পরিশ্রম, সঠিক মেধা প্রয়োগে আর্থিক লাভবান হওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজের শিক্ষাজীবনকে আরও অনুপ্রাণিত করে তুলতে পারেন। 

আরও পড়ুন

×