ঈদের ছুটিতে
বাড়ি ফেরার আনন্দ
ঈদে শিকড়ে ফেরার তোলপাড় করা উন্মাদনা বাঙালি তরুণ ছাড়া আর কাউকেই ছুঁয়ে যায় না... ছবি: জেমেনি এআই ন্যানো ব্যানানা
আলাউদ্দিন আলাদিন
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১৫:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদ মানেই আনন্দ! সেই আনন্দ প্রিয় মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিক্ষার্থীরা রওনা হন গ্রামের উদ্দেশে। শহর থেকে গ্রামে, শিকড়ে ফেরার এমন তোলপাড় করা আবেগ নিয়ে ঈদ উৎসবের উন্মাদনা বোধ হয় বাঙালি তরুণ ছাড়া আর কাউকেই ছুঁয়ে যায় না। তরুণদের সঙ্গে কথা বলে ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দঘন মুহূর্ত তুলে ধরেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন
ক্লাস, লাইব্রেরি, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে পার হয়ে যায় বছরের দিনগুলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবনপঞ্জিকা থেকে একটি একটি করে দিন হারিয়ে যায়। প্রত্যাশিত স্বপ্নের সোনালি ভবিষ্যতের ছবি হৃদয়ে ধারণ করে তাকে পাওয়ার পূর্ণ মন-বাসনা নিয়ে ছুটে চলে। এভাবে নিরন্তরভাবে ছুটে চলতে গিয়ে কখনও কখনও হাঁপিয়ে ওঠে মন। অবসাদও পেয়ে বসে মাঝে মধ্যে। তাই স্বাভাবিকভাবেই দেহ-মন চায় বিশ্রাম। একটু আনন্দ সুর-ছন্দে হারিয়ে যেতে কিছুক্ষণ; উচ্ছ্বাসমুখর কোনো দিন বা ক্ষণ পেতে। এ ব্যস্ত জীবনে সে রকম সময় খুব একটা মেলে না। সে কারণে অন্যদের মতো শিক্ষার্থীরাও অপেক্ষায় থাকেন কখন হবে ছুটি। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে এ আগ্রহটা থাকে প্রচণ্ড। ঈদের ছুটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী।
ঈদ মানেই আনন্দ
ঈদ মানেই আনন্দ! সেই আনন্দ প্রিয় মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ রওনা হয় তার গ্রামের উদ্দেশে। তেমনি আনন্দ ভাগ করে নেওয়া মানুষের দলে রয়েছেন ঢাকার বাইরে থেকে পড়তে আসা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কেবল ঢাকাই নয়; সারাদেশের বিভাগীয় এবং জেলা শহরেও পড়তে যান তরুণরা। দেশের বাইরে তো রয়েছেনই! আজকাল দেশের বাইরের অনেক শিক্ষার্থীও ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়ি ফেরেন। কারণ, ঈদের প্রকৃত আনন্দ যে গ্রাম কিংবা জন্মস্থানেই!
একটু আগেই বাড়ি ফেরা
একটু সচেতন যারা। কিংবা যারা এড়িয়ে চলতে চান যাত্রাপথের ভোগান্তি তাদের অনেকই এরই মধ্যে বাড়ি ফিরেছেন। তারা ছুটির অপেক্ষায় বসে থাকেন না। বরং নিজেরই নিজেদের দিয়ে দেন ছুটি। তারা হাতের করে দিন না গোনে, টিকিটের অপেক্ষার প্রহর না গোনে বাড়ি ফেরেন সব স্বাভাবিক থাকা অবস্থাতেই! বিশেষ করে ঈদযাত্রার ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে অনেকের বাবা-মাও প্রিয় সন্তানকে আগাম বাড়ির পথ ধরতে বলেন।
ঘরে ফেরা নিয়ে যা বললেন তারা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা। তবু তরুণরা মানেন না বাধা। তারা ছুটছেন বাড়ির পথে। এবার ঈদে ঘরে ফেরা নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আবাসিক ছাত্র হল হচ্ছে এমএজি ওসমানী হল। এখানেই বিভিন্ন স্থান থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসস্থল। হলের সুনসান নীরবতাই যেন বলে দিচ্ছিল, মায়ার অদ্ভুত টানে এতদিনে চলে গেছেন প্রায় অনেক শিক্ষার্থী। যেমন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র বাহা উদ্দিন বলেন, ‘আমি এসেছি সেই মাদারীপুর থেকে। বছরের অন্যান্য সময়েও গ্রামে যাই। তবুও এটা ঈদের দিন বলে কথা। অবশ্যই আমি ওই সময়টুকু কাটাতে চাই আমার মা-বাবার সঙ্গে।’ পাশ থেকে একই বর্ষের ছাত্র মিনহাজুল আবেদীন বলেন, ‘সুদূর দিনাজপুর থেকে এখানে এসেছি উচ্চশিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করব বলে। তবে সেটি যেমন আমার নিজের সম্মান বাড়াবে, সে সঙ্গে আমার পরিবারেরও। তাই আর কী! প্রিয় মানুষের জন্য এখানে আসা, তাদের সঙ্গেই কাটাতে চাই ঈদের বিশেষ মুহূর্তগুলো!’ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলেন বরগুনা থেকে পড়তে আসা একই বর্ষের ছাত্র ফাতিন। তবে রোদেলার মুখে শোনা গেল একটু ভিন্ন কথা–‘আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি আমার শৈশব জড়িত স্থান খুলনা। তাই সময় পেলেই ছুটে যাই সেখানে। তাছাড়া ঈদ বলে কথা! এখন যাবই। অন্যদিকে মায়ের সঙ্গে আমাকে অনেক কাজ করতে হয় ঈদের দিন। এটিই আমি বেশি পছন্দ করি। তাছাড়া ঈদের ছুটিতে নিজের ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে। একজন মেয়ে হিসেবে এটাই তো স্বাভাবিক বিষয় তাই না?’ মাথা দুলিয়ে বলি, অবশ্যই! ফারাবী, শাহনেওয়াজ, দুরদানা, ফারিহা, হাসনাইন আর মৃদুলের সঙ্গে তখন ঘরে ফেরা নিয়ে আরও কথা হয় টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র শোয়াইবের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সারাটা বছর আমরা ব্যস্ত থাকি একাডেমিক বিভিন্ন কাজ নিয়ে। ঈদ একজন ছাত্রের কাছে আসে দম ফেলানোর মতো স্বস্তির বাতাস নিয়ে। এ সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাই। প্রতি বছর ঈদে শত কষ্টের পর যখন নিজ গ্রামে পৌঁছি, তখন সব কষ্টই যেন উবে যায়।’ পাশ থেকে তাঁর বন্ধু ইনাম হোসাইনের কণ্ঠেও যেন একই সুর–‘আমি বাবা-মায়ের বড় ছেলে। তাই আমার দায়িত্ব যেন একটু বেশি। চুয়াডাঙ্গা আমার গ্রামের বাড়ি। তাই চুয়াডাঙ্গা গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি বিভিন্ন বাজার-সদাই নিয়ে। ঈদের বাজার বলেই নিজেই সব করতে উপভোগ করি।’
একইভাবে কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে। রোকেয়া হলে থাকা রুবা জানালেন ঈদে বাড়ি ফেরা মুহূর্তটুকুর কথা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল আমার পরিবার। সব ঠিকঠাক হলো। গণতান্ত্রিক সরকার এলো। এখন মনের আনন্দে বাড়ি ফিরবো। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে যুদ্ধ। এতে কিছুটা খারাপ লাগছে। তবে সত্যি বলতে সারা বছর ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। মায়ের আদরমাখা মুখটি দেখি না কতদিন। তাই ঈদের ছুটিতে অনেক ভিড় সামলেও ছুটতে থাকি ঈদের আনন্দটুকু পরিবারের সঙ্গে কাটাতে।’ রুবার কথা শুনে পাশে থাকা ফাহমিদা, সুপ্তি, মাহিন, সানিও যেন কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন। চট্টগ্রাম থেকে পড়তে আসা ফাহমিদা বলেন, ‘জীবনের শত ব্যস্ততার মধ্যেও এ ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরে যাই মায়ের হাতে সেমাই আর আব্বুর কাছ থেকে সেলামি পেতে। উফ কী যে আনন্দ! আর ছোটবেলা থেকেই আমার পাড়া বেড়ানোর স্বভাব। ঈদের দিন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই বান্ধবীদের নিয়ে পাড়ার এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরতে থাকি। এতে সবার সঙ্গে দেখা হয়; সালামিটাও পাওয়া যায়!’
আনন্দের ঝাপ্টা যেন মাহিনের গায়ে এসেও লাগল, ‘শৈশবের সেই সময়গুলো যেন এখনও সজীব আর তাই এ সজীবতাকে টিকিয়ে রাখতেই ছেলেবেলার রাজশাহীতে ফিরে যাই ঢাকার কোলাহোল, গাড়ির জ্যাম, বাড়ি ফেরার টিকিটের প্রতিযোগিতা–সব জঞ্জাল এক নিমেষেই উড়ে যায় যখন বাড়ি ফিরে মা-বাবা আর ছোট্ট বোনটির মুখটি দেখি। সত্যি কথা বলতে কী, আমি গ্রামের একটা গন্ধ পাই। এই গন্ধই আমাকে মুগ্ধ করে তোলে।’
সুপ্তির আনন্দটা অবশ্য অন্য জায়গায়। বললেন, ‘শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে একটা সময় প্রচুর সময় কাটিয়েছি। হারানো সেই দিনগুলো খুব মনে পড়ে। পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সব মিলিয়ে এখন বাড়ি থেকে অনেক দূরে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। শুধু ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার সময় পাই। তাই এই ছুটিতে চাই শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে প্রিয় কিছু সময় কাটাতে।’
কথা শেষ করতেই মুখে ফুটল নির্মল হাসি। এ হাসিই বলে দিচ্ছিল যেন–রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ। তাই এ গানের মতোই কাটুক প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ঈদ!
