ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মেসির সারা

মেসির সারা
×

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে নির্বাক অপলক চোখে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে মেসি

ক্রীড়া প্রতিবেদক, নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফিরিয়ে দেওয়া সোনালি ট্রফিটার পাশ দিয়ে যখন তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, অবয়বে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা; যেন বিশ্বজয়ের ওই প্রগাঢ় আলোকবৃত্তও তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে যখন মেডেলটা গলায় পরছেন, তখনও ঠোঁটের কোণে ধরে রেখেছেন এক যান্ত্রিক, অতিমানবিক স্বাভাবিকতা। কিন্তু নিয়তি বোধহয় তাঁর জন্য অন্য এক নাটকের চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। যখনই গ্যালারির ওই অতলান্ত নীল-সাদার মহাসমুদ্র থেকে হাজারো কণ্ঠের ‘মেসি, মেসি’ গর্জন আছড়ে পড়ল, ঠিক তখনই অলক্ষ্যে কোনো এক অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভেতরে এতক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা আবেগের অতলান্ত পুকুরটা যেন নিমেষেই উথলে উঠল চোখের কোণে। বেয়ে নামল এক নিস্তব্ধ ভাঙনের শ্রাবণ। এ কোনো সাধারণ কান্না নয়, এ যেন এক জমে থাকা অভিমানের একলা মেঘমল্লার। নিথর, স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন প্রায় ১০টি মিনিট। 

অপলক চেয়ে রইলেন সেই গ্যালারির দিকে, যেখানে তাঁর জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ ধুলোবালি উড়ছে। কোনো হুংকার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই; শুধু নির্বাক, অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন ওই গ্যালারির দিকে। তখনও মাঠের এক পাশে ট্রফি বিতরণ চলছিল, লাউড স্পিকারে বারবার স্প্যানিশ ফুটবলারদের নাম শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন বোধ ছিল না তাঁর। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন স্থির হয়ে সেই আর্জেন্টিনার গ্যালারির সামনে। তাঁর পাশে এরপর এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর দলের সবাই। কোনো কথা নেই, হাত নাড়ানো নেই, শুধু মাথা তুলে গ্যালারির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা। ওই ১০টি মিনিট আসলে নিছক কোনো সময় ছিল না, ওটা ছিল নিজের জীবনের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচের বালুচরে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দুই দশকের অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের পাতা ওল্টানো। ফুটবল দুনিয়ার অলিখিত ব্যাকরণ বলে, মহাতারকাদের নাকি কাঁদতে নেই, তাদের আবেগের প্রকাশ হতে হয় ইস্পাতকঠিন। নিয়মের নিগড় ভেঙে আজ মনে হলো, ঈশ্বরের বরপুত্রও দিন শেষে রক্ত-মাংসের এক নশ্বর মানুষ। 

ম্যাচের পর দর্শকদের সঙ্গে হৃদয় ভাঙার ব্যথাটা শেয়ার করে আর মিডিয়ার সামনে আসেননি মেসি। তাঁর দলেরও কেউ না। নিয়ম থাকায় শুধু এসেছিলেন তাদের কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনিও শেষ করতে পারেননি সংবাদ সম্মেলন। এটাই মেসির শেষ ম্যাচ ছিল কিনা? প্রশ্নটি করেছিলেন বুয়েন্স আয়ার্সের এক সাংবাদিক। উত্তর দিতে গিয়ে স্কালোনি শুধু বলেছেন, ‘তিনি এই ব্যাপারে কথা বলেননি মেসির সঙ্গে। ওর এখন ৩৯ বছর বয়স, এটা সত্যিই ভাবা যায় না, অকল্পনীয়। এই বিশ্বকাপে ও যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য। আশা করি, সবাই তাঁর অর্জনের জন্য তাঁকে নিয়ে গর্বিত হবে, কারণ সে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়। এটা নিয়ে আমার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই।’ আগামী বিশ্বকাপে মেসির বয়স হবে ৪৩। অঙ্কটা মেলানো সত্যিই কঠিন। রোনালদো ফিটনেস ধরে রেখে এবার একচল্লিশে খেলেছেন। 

অফিসিয়াল ঘোষণা না দিলেও নিজের একটি ইচ্ছার কথা তিনি বিশ্বকাপের আগে এক সাক্ষাৎকারেই বলেছিলেন। তাহলো আর্জেন্টিনার কোনো ঘরের মাঠ থেকে তিনি বিদায় নিতে চান প্রিয় গ্যালারির কাছ থেকে। তবে স্কালোনি জানুক আর না জানুক এটা অন্তত সবাই জেনে গেছে যে আর্জেন্টিনার একটা ‘সোনালি অধ্যায়’ এবং সোনালি প্রজন্মের বিদায় হয়ে গেল স্পেনের কাছে এই ফাইনাল হেরে। নিউ জার্সির মিডিয়া সেন্টারে বসা অনেক আর্জেন্টাইন সাংবাদিক বলাবলি করছিলেন স্কালোনি-মেসি জুটির সমাপ্তি দেখে নিয়েছে সবাই। আর যাই হোক স্কালোনিকে কোচ হিসেবে আর রাখা হচ্ছে না। ২০১৮ সালে স্কালোনি আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই মানিকজোড় আলবিসেলেস্তেদের দীর্ঘ ট্রফিখরা কাটিয়ে মোট চারটি প্রধান আন্তর্জাতিক শিরোপা উপহার দিয়েছেন; যার মধ্যে রয়েছে ২০২১ ও ২০২৪ সালের ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ইউরোপ-আমেরিকা শ্রেষ্ঠত্বের ফিনালিসিমা এবং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কাতার ২০২২-এর ফিফা বিশ্বকাপ। 

এর আগেও মারাকানার ঐতিহাসিক মাঠে যখন বিষাদের সুর বেজেছিল, তখন অঝোরে কেঁদেছিলেন মেসি; নিউ জার্সির এই স্টেডিয়ামেও এর আগে ঝরেছে তাঁর চোখের জল–তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের এই কান্নাটি ছিল একেবারেই নিস্তব্ধ, এক অদ্ভুত পাথরচাপা নীরবতায় ঘেরা। ৩৯ বছর বয়সে এসেও টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি যেভাবে একাই ৮টি গোল করলেন ও ৪টি অ্যাসিস্ট সাজালেন, খাদের কিনারা থেকে দলকে মহাবীরের মতো কামব্যাক করালেন এবং এক অতন্দ্রপ্রহরীর মতো নেতৃত্ব দিলেন; তাতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কারটি নিঃসন্দেহে তাঁরই প্রাপ্য ছিল। চিরকাল একদল সমালোচক মুখিয়ে থাকে এটা বলার জন্য যে ফিফা নাকি সবসময় মেসিকে বাড়তি সুবিধা দেয় বা নিজেদের দিকে টানে। কিন্তু ট্র্যাজিক ফাইনালের পর পুরস্কার মঞ্চে সবাই দেখল, বিশ্বমঞ্চে বীরোচিত লড়াইয়ের পরও সেই মেসিই কীভাবে সবচেয়ে বড় উপেক্ষার শিকার হলেন, যখন তাঁর হাত ফসকে স্পেনের রদ্রির কাছে চলে গেল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান। এই অবিচার দেখে ক্ষুব্ধ ফুটবল আইকন জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ স্পষ্ট ভাষায় ফিফার দ্বিমুখী নীতিকে কাঠগড়ায় তুলে বলেছেন, ‘গোল্ডেন বল জিততে মেসিকে আর ঠিক কী করতে হতো? আমি তো এদের বিচারবুদ্ধির কোনো ব্যবচ্ছেদই খুঁজে পাই না! ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ না জিতেও লুকা মড্রিচ যদি টুর্নামেন্টসেরা হতে পারে, তবে এবার কোন নিয়মে মেসির মাপকাঠি বদলে গেল?’ ইব্রার এই বিস্ফোরক মন্তব্যই প্রমাণ করে, নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় ট্রফি ভাঙলেও এই জাদুকরের শ্রেষ্ঠত্ব আর ফুটবলীয় আত্মত্যাগ খোদ ফুটবল-বিধাতার চেয়েও অনেক বেশি মহিমান্বিত।

আরও পড়ুন

×