পায়ের যত্ন কেন জরুরি?
কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য পা অত্যন্ত নাজুক একটি অঙ্গ। সঠিক যত্নের অভাবে ডায়াবেটিস পায়ের মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। ডায়াবেটিসের কারণে মূলত দুইভাবে পায়ের ক্ষতি হয়। প্রথমত, এটি পায়ের স্নায়ু বা নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার কাজ হলো অনুভূতি বহন করা। স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে পায়ে কোনো অনুভূতি থাকে না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির পায়ে কোনো আঘাত লাগলেও তিনি ব্যথা অনুভব করেন না। এ কারণে ছোটখাটো আঘাত থেকেও অলক্ষ্যে বড় ক্ষত বা ঘা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালির রোগ হয়। ফলে পায়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। রক্ত সঞ্চালন কমে গেলে পায়ে হওয়া যে কোনো ঘা শুকাতে অনেক সময় লাগে। এ ছাড়া রক্তে চিনির মাত্রা বেশি থাকায় ইনফেকশন সব সময় সতেজ থাকে এবং দ্রুত ছড়ায়। ফলে সাধারণ কোনো ক্ষত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে পচন বা গ্যাংগ্রিন (Gangrene) হয়ে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ডায়াবেটিক রোগীদের নিয়ম মেনে পায়ের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পায়ের যত্নের নিয়মাবলি
১. নিয়মিত পা পর্যবেক্ষণ: ডায়াবেটিক রোগীদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে আয়নার সাহায্য নিয়ে বা প্রয়োজনে পরিবারের অন্য সদস্যের সহায়তায় পা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা উচিত। পায়ে কোনো কাঁটা বা ছেঁড়া অংশ, ফোসকা, লালচে ভাব, ফুলা, বা নখের কোনো সমস্যা আছে কিনা, তা দেখতে হবে। দুই আঙুলের মাঝখানের অংশে অনেক সময় ছত্রাকের আক্রমণ (Fungal infection) হতে পারে। তাই সেই জায়গাগুলোও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
২. প্রতিদিন পা পরিষ্কার করা: প্রতিদিন কুসুম গরম পানি ও মৃদু সাবান দিয়ে পা ধুতে হবে। পা ধোয়ার পর নরম ও শুকনো কাপড় বা টিস্যু পেপার দিয়ে ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে।
৩. আর্দ্রতা বজায় রাখা: ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ুর সমস্যা হলে পায়ের স্বাভাবিক ঘাম নিঃসরণ কমে যায়। ফলে পা অতিরিক্ত শুকনো ও খসখসে হয়ে যেতে পারে। শুকনো পা ফেটে অনেক সময় ঘা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৪. সঠিক পাদুকা নির্বাচন: যাদের স্নায়ুর সমস্যা বা নিউরোপ্যাথি (Neuropathy) রয়েছে, তারা কখনোই খালি পায়ে হাঁটবেন না, এমনকি ঘরের ভেতরেও না। বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতা পরতে হবে। জুতা খুব টাইট বা খুব ঢিলেঢালা হওয়া যাবে না। সব সময় পরিষ্কার ও সুতির মোজা ব্যবহার করা উচিত।
৫. ফোসকা বা কড়া কাটা নিষেধ: পায়ে ফোসকা, কড়া বা গুটি উঠলে নিজে নিজে কখনোই তা কাটার বা ব্লেড দিয়ে অপসারণ করার চেষ্টা করবেন না। ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের চেষ্টা থেকে মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে। যে কোনো সমস্যার জন্য দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৬. নিয়মিত চেকআপ ও ব্যায়াম: বছরে অন্তত একবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পায়ের স্নায়ুর সংবেদনশীলতা এবং রক্তনালির রক্তপ্রবাহের অবস্থা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। পায়ের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য নিয়মিত হাঁটা বা পায়ের হালকা ব্যায়াম করতে হবে। সর্বোপরি, ডায়াবেটিসে পায়ের জটিলতা এড়াতে রক্তে চিনির মাত্রা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান বর্জন করা এবং সঠিক খাদ্যশৃঙ্খলা মেনে চলা আবশ্যক।
লেখক : মেডিসিন স্পেশালিস্ট ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, সিএমএইচ, ঢাকা।
- বিষয় :
- পায়ের যত্ন
