ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টাকায় ঋণ দিচ্ছে আইএফসি

টাকায় ঋণ দিচ্ছে আইএফসি
×

ছবি: সংগৃহীত

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ১১:৪২ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১৪:০০

বাংলাদেশি কোম্পানি পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসকে টাকায় ঋণ দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। দেশীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের ঋণ সমন্বয়ের জন্য এ ঋণ অনুমোদন করেছে সরকারের বাছাই কমিটি। টাকায় দেওয়া ঋণের সুদহার হিসাবায়ন, আদায় সবই হবে টাকায়। আপাতত উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাবে না এমন শর্ত যুক্ত করে পপুলার ফার্মাকে ৩০ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ঋণ নেওয়ার অনুমোদন করা হয়েছে। মেঘনা গ্রুপ একই ধরনের ৮০ মিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদন করলেও তা নাকচ হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইএফসি, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার খরচ তুলনামূলক কম। এ ছাড়া তাদের সব ধরনের আয় করমুক্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর সাড়ে ৩৭ শতাংশের বেশি কর পরিশোধ করতে হয়। ফলে এভাবে সরাসরি টাকায় ঋণ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। যে কারণে এসব সংস্থা সরকার কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে প্রকল্পে অর্থায়ন করলেও এর আগে কখনও তাদের জন্য টাকায় ঋণ দেওয়ার অনুমোদন ছিল না। টাকায় ঋণ দেওয়ার ফলে অবশ্য শিল্প গ্রুপটির বিনিময়হার জনিত লোকসানের ঝুঁকি নেই।

বিডা সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ অনুমোদন-সংক্রান্ত বাছাই কমিটির গত ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত  বৈঠকে আইএফসির ‘টাকা ঋণ’ অনুমোদন হয়। বর্তমান বিনিময়হার অনুযায়ী যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে এ সংক্রান্ত বাছাই কমিটির সভাপতি থাকেন গভর্নর। ২০১০ সাল থেকে এ-সংক্রান্ত কমিটি বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দিয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে গত এপ্রিলের সভায় টাকায় ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।

জানা গেছে, আইএফসি থেকে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের ঋণের সুদহার ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এই ঋণ দিয়ে তারা উচ্চ সুদের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ঋণ সমন্বয় করতে চায়। এ জন্য ৮ বছর মেয়াদি ঋণ নেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক পপুলার ফার্মার ঋণে ঠিক কত শতাংশ সুদ নিচ্ছে তা জানা যায়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ গত মার্চের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ঋণের গড় সুদহার ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ হিসাবে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের গড় সুদহারের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ কম সুদে এ ঋণ পাচ্ছে পপুলার ফার্মা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভোগ্যপণ্য খাতের অন্যতম শিল্প গ্রুপ মেঘনা চারটি জাহাজ কেনার জন্য ৮০ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার আবেদন করে। তবে প্রতিষ্ঠানটির আবেদন নাকচ করে দিয়েছে সরকারি বাছাই কমিটি। বাংলাদেশি কোম্পানিকে ব্যাপকভাবে টাকায় বিদেশি ঋণ অনুমোদন করলে স্থানীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেওয়ার চাহিদা কমবে। বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ব্যাংক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে সক্ষমতা হারাবে। এসব কারণে আপাতত সরকার ব্যাপকভাবে এ ধরনের ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দেবে না বলে জানা গেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা পরিশোধের দায় বাংলাদেশের ওপর বর্তায়। যে কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের ঋণ অনুমোদনে অনেক যাচাই-বাছাই করা হয়। দেখা গেল প্রতিষ্ঠানটি হয়তো স্থানীয় বাজারে ভালো পণ্য সরবরাহ করছে, তার কোনো রপ্তানি নেই। এ রকম ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হয় না।

এর আগে এডিবি এবং আইএফসি টাকায় ঋণ দেওয়ার অনুমতি চেয়েও পায়নি। ২০২১ সালে একবার টাকায় ঋণ দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করে তারা। তবে দেশের সামগ্রিক মুদ্রা ও আর্থিক বাজার পরিস্থিতি এবং তারল্য ও বাজার ঝুঁকি বিবেচনা করে সরাসরি টাকায় ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সালের মে মাসে এডিবি বাংলাদেশের বাইরে টাকা বন্ড ইস্যু করে সংগ্রহ করা তহবিল বাংলাদেশের বাজারে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ দেখায়। তার আগের মাসে আইএফসি বাংলাদেশের বাজারে টাকা বন্ড ইস্যু করে ঋণ দেওয়ার অনুমোদন চেয়েছিল। তবে সরাসরি তা নাকচ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই সময়ের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া সভরেন ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তত্ত্বাবধানে অগ্রাধিকার খাতের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এসব সংস্থার অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সরাসরি টাকায় ঋণের সুযোগ দিলে চলমান বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কর্মসূচির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। টাকায় সরাসরি ঋণ দিতে কোনো একটি সংস্থাকে সুযোগ দিলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থা একই সুবিধার জন্য চাপ প্রয়োগ করবে। আগামীতে স্বল্প সুদের প্রকল্পের মাধ্যমে ঋণের পরিবর্তে সরাসরি টাকায় ঋণ দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে। ফলাফল হিসেবে দেশের আর্থিক খাত ও মুদ্রানীতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ সংকুচিত হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাংলাদেশের প্রচলিত আয়কর আইন অনুযায়ী আইএফসি, এডিবির মতো সংস্থার আয় সব ধরনের কর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। ফলে এখানে তাদের টাকায় ঋণ দেওয়ার সুযোগ দিলে স্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে।

২০১৫ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে ১০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ টাকায় ‘বাংলাবন্ড’ ইস্যুর অনুমোদন পায় আইএফসি। বাংলাবন্ডের আওতায় ২০২০ সালে ১১ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে প্রাণ গ্রুপকে ঋণ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে দেশীয় ব্যাংকের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ঠিক করে দেওয়া হয় ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় বলা হয়, দেশে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের কারণে এ রকম বন্ডে উপযোগিতা হারিয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের বাজারে আইএফসির টাকা বন্ডের আওতায় দেশের অগ্রাধিকার খাতগুলোর জন্য ঋণ শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রকল্প আকারে দেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন

×