ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

ইলন মাস্ক কেন যুক্তরাজ্যে সরকার পতন ও ডানপন্থীর উত্থান চান

ইলন মাস্ক কেন যুক্তরাজ্যে সরকার পতন ও ডানপন্থীর উত্থান চান
×

মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। ইলাস্ট্রেশন: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:০৪ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৭:৪৮

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে গত শনিবার অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ মানুষ। ডানপন্থীদের ডাকা ওই সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। তিনি যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ও সরকার পরিবর্তনের দাবি জানান।

বিক্ষোভটির আয়োজন করেছিলেন ব্রিটেনের ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী টমি রবিনসন (আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন)। রবিনসন বিক্ষোভ চলাকালে ইলন মাস্ককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্রিটেনে যারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে ভয় পায় তাদের জন্য কী বার্তা দেবেন।

জবাবে মাস্ক বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে সহিংসতা আপনাদের কাছেও পৌঁছাবে। আপনারা বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে না চাইলেও সহিংসতা আপনাদের দিকে ধেয়ে যাবে। 

বক্তব্যে মাস্ক আরও বলেন, ‘আপনাদের হয় প্রতিরোধ করতে হবে, নয়তো মরতে হবে।’ মাস্কের এমন বক্তব্যের দিনেই সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আহতদের মধ্যে তাদের কর্মীই অন্তত ২৬ জন। বিক্ষোভকারীরা হামলা ও ভাঙচুর করায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মাস্ক যা বলেছিলেন
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ও সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বক্তব্যে মাস্ক বলেছিলেন, ‘যুক্তরাজ্যে বৈপ্লবিকভাবে সরকার পরিবর্তন দরকার। ব্রিটেনের সরকারে ব্যাপক আকারে সংস্কার হওয়া জরুরি। এখানে জনগণের হাতে ক্ষমতা থাকবে। কোনো নির্দয় আমলাতন্ত্রের হাতে নয়।’

লন্ডনে বিক্ষোভ চলাকালে বড় পর্দায় প্রচার করা হয় ইলন মাস্কের ভাষণ। ছবি: সংগৃহীত

মাস্ক আরও বলেন, ‘সরকারে পরিবর্তন আনতে হলে জনগণকে সংগঠিত করা দরকার।’ তিনি বলেন, ব্রিটেনের ধ্বংসের জন্য ব্যাপক অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন দায়ী। সমাবেশে অংশ নেওয়া লাখো জনতার উদ্দেশে মাস্ক বলেন, ‘সহিংসতা আরও বাকি।’

মাস্ক শুধু যে ব্রিটেনের সরকার পতন চাইছেন এমনটিই নয়। গত দুই বছরে বিশ্বের ১৮টি দেশে ডানপন্থীদের উত্থানে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। যেটির সবশেষ উদাহরণ যুক্তরাজ্য।

প্রশ্ন হলো মাস্ক কেন ডানপন্থীদের উত্থানে সমর্থন দিচ্ছেন? যুক্তরাজ্যে সরকার পতন চাওয়ার কারণই বা কী? এটি বোঝার জন্য উদাহরণ হিসেবে মাস্কের সঙ্গে ডানপন্থী নেতা টমি রবিনসনের সখ্যতার দিকে নজর দেওয়া যাক। 

কে এই টমি রবিনসন
বিলুপ্তপ্রায় অভিবাসনবিরোধী সংগঠন ইংলিশ ডিফেন্স লীগ (ইডিএল) এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন রবিনসন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য উইকের নিবন্ধ অনুযায়ী, রবিনসন বড় পরিসরে দৃশ্যপটে আসেন ‘গ্রুমিং গ্যাং কেলেঙ্কারি’ নিয়ে কথা বলায়। গ্রুমিং গ্যাং হলো ব্রিটেনে শিশু নির্যাতনকারীদের একটি দল। ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই দল প্রায় ১ হাজার ৪০০ কন্যা শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। 

আল জাজিরা বলছে, রবিনসন উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী এবং অভিবাসন ও ইসলামবিরোধী প্রচারের জন্য সমালোচিত। গ্রুমিং গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ২০১৮ সাল থেকে ফেসবুক ও এক্সে (সাবেক টুইটার) ব্রিটিশ সরকারের সমালোচনা শুরু করেন তিনি। তবে তিনি বেশি আলোচিত হন এক অভিবাসী স্কুলছাত্র ও তার পরিবারের মানহানি করায়। 

লন্ডনে বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজক টমি রবিনসন। ছবি: এএফপি

২০১৮ সালে নিজের ফেসবুক পোস্টে জামাল হিজাজি নামের এক সিরিয়ান শরণার্থী স্কুলছাত্রের ভিডিও আপলোড করে দাবি করেছিলেন, হিজাজি যুক্তরাজ্যের এক কন্যা শিশুর ওপর আক্রমণের জন্য দায়ী। রবিনসনের এমন পোস্টের পর জামালের পরিবার হত্যার হুমকির মুখে পড়ে। পরে এ নিয়ে মামলা হলে আদালত ২০২১ সালে রবিনসনকে ১ লাখ ২৪ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করেন। 

আদালতের নিষেধাজ্ঞা স্বত্বেও রবিনসন ২০২৩ সালে ফের পোস্ট দিতে শুরু করেন। এবার তিনি একটি তথ্যচিত্র বানিয়ে তৎকালীন টুইটারে (বর্তমান এক্স) পোস্ট করেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় পরের বছর আদালত রবিনসনকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেন। ওই বছরই দৃশ্যপটে আসেন ইলন মাস্ক। তিনি রবিনসনের ওই তথ্যচিত্রটি রিটুইট করেন। এরপর একাধিকবার রবিনসনের কারামুক্তির দাবিতে এক্স-এ পোস্ট দেন।

মাস্ক কেন রবিনসনের পক্ষে
মাস্ক মূলত ডানপন্থী রাজনীতির পক্ষে। গত দুই বছরের তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ বলছে, বিশ্বের ১৮টি দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন, নীতি ও প্রশাসনকে ইলন মাস্ক উৎসাহ দিয়েছেন। ডানপন্থীদের এসব আন্দোলন অভিবাসন হ্রাস ও ব্যবসার ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়েছে।   

সম্প্রতি জার্মানিতে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের পেছনে মাস্কের ভূমিকা দেখা হচ্ছে। মাস্ক ব্রাজিল ও আয়ারল্যান্ডে ডানপন্থী সড়ক আন্দোলনের প্রতিও সমর্থন জানিয়ে অনলাইনে পোস্ট দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের নতুন রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রীকেও স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর্জেন্টিনা ও ইতালির ডানপন্থী নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট সেন্সর করার ব্যাপারে ভারত ও তুর্কিয়ের (তুরস্ক) ডানপন্থীদের অনুরোধও মেনে নিয়েছে মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম এক্স।

বিশ্বের ১৮টি দেশে ডানপন্থীদের উত্থানে সমর্থন দিয়েছেন মাস্ক। ছবি: এনবিসি নিউজমাস্ক যেসব দেশের ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের সমর্থন দেন গত ফেব্রুয়ারিতে এমন ১৮টি দেশের তালিকা প্রকাশ করে এনবিসি নিউজ। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যও আছে। গত বছরের ডিসেম্বরে মাস্ক এক্স পোস্টের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকে এর নেতা নাইজেল ফ্যারেজের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করতে শুরু করেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি নাইজেলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এরপর থেকে তিনি টমি রবিনসনের কারামুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। গত জানুয়ারিতেই রবিনসনের মুক্তি ও ব্রিটেনে সংস্কারের দাবিতে এক্সে একাধিক পোস্ট দেন ইলন মাস্ক।

ইতালির ফ্লোরেন্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ম্যানুয়েলা কায়ানি দীর্ঘদিন ধরে উগ্র-ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর ওপর নজর রাখছেন। তিনি বলছেন, মাস্ক মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক ও আদর্শগত কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব আন্দোলন সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় লোকজন তাঁর কথা শোনে। 

ম্যানুয়েলা কায়ানি বলেন, একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে কথা বলছেন, প্রভাব বিস্তার করছেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছেন। এটি খুবই বিপদজনক। 

মাস্ক কেন সরকার বদল চান
সিএনএন বলছে, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ইলন মাস্কের হস্তক্ষেপের চেষ্টা বেশ আগে থেকে। টমি রবিনসন ‘গ্রুমিং গ্যাং’ কেলেঙ্কারি নিয়ে আওয়াজ তোলার সময় থেকেই মাস্ক কিয়ার স্টারমার প্রশাসনের সমালোচনা করছেন। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের অনলাইন নিরাপত্তা আইনেরও সমালোচনা করেন। দাবি করেন, এই আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। 

অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় প্রায় ১ লাখ মানুষ। শনিবার লন্ডনে। ছবি: এএফপি

গ্রুমিং গ্যাং কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত জানুয়ারিতে মাস্ক বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কারাগারে থাকা উচিত। ইনডিপেনডেন্ট বলছে, গত গ্রীষ্মেও ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল। মাস্ক তখনও মন্তব্য করেছিলেন, ‘গহযুদ্ধ অনিবার্য’।

কিয়ার স্টারমারের প্রশাসনিক নীতিরও সমালোচনা করেছেন মাস্ক। তাঁর অভিযোগ, স্টারমারের পুলিশ প্রশাসনের নীতি হলো ডানপন্থীদের ওপর আগ্রাসী হওয়া। বিপরীতে বামপন্থীদের প্রতি নমনীয় থাকা। 

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টি মধ্য-বাম ধারার রাজনৈতিক দল। মাস্ক ইউরোপজুড়ে ডানপন্থীদের উত্থানে সমর্থন জোগাচ্ছেন। সুতরাং তাঁর পক্ষে বামপন্থী সরকারের পতন চাওয়াটাই স্বাভাবিক।

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস্কের এমন চাওয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যে সমালোচনা আছে। সবশেষ বিক্ষোভ সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন স্টারমার প্রশাসনের ব্যবসা বিষয়ক সচিব পিটার কাইল। তিনি বলেছেন, ‘মাস্কের মন্তব্য একেবারেই অনুপযুক্ত। তিনি কেন এমন বক্তব্য দিয়েছেন তা বোধগম্য নয়।’ আর স্টারমার বলেছেন, সহিংসতার কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না।

আরও পড়ুন

×