ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

জিনজিয়াংয়ের অবস্থা একাত্তর পূর্ব বাংলাদেশের মতো: লিলি হার্ডিং

জিনজিয়াংয়ের অবস্থা একাত্তর পূর্ব বাংলাদেশের মতো: লিলি হার্ডিং
×
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২০ | ০২:৪৭ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০ | ০৩:৩৪

চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের অবস্থা মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) মতো হতে চলেছে। সেখানকার জনগণ চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শঙ্কায় রয়েছে। তারা চায় একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। তবে সিসিপি জিনজিয়াং নিয়ন্ত্রণ করলে গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা সেখানকার জনগণের স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে।

চীনের অধিকারকর্মী লিলি হার্ডিং 'দ্য কূটনীতি'র এক মতামত কলামে এসব কথা লিখেছেন। খবর দ্য ইকোনমিক টাইমসের

হার্ডিং লিখেছেন, ‘পূর্ব তুর্কিস্তান’ নামে পরিচিত জিনজিয়াং কৌশলগতভাবে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারের কাছে এখানকার জনগণের কোনো মূল্য নেই।

উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চলের আগের নাম ‘পূর্ব তুর্কিস্তান’। এখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এর নাম বদলে করেছে ‘জিনজিয়াং প্রদেশ’। ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের বসবাস এখানে। এর বেশিরভাগই উইঘুর সম্প্রদায়ের মুসলিম।

উইঘুর মুসলমান অধ্যুষিত জিনজিয়াংয়ের প্রতি চীনের আচরণ বোঝাতে হার্ডিং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময় এদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানের আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ টানেন। 

তিনি বলেন, জিনজিয়াংয়ের ভূখণ্ড এবং মানুষের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গী সত্যিকার কলোনিয়ালিস্টদের মতো। কেবল অর্থনৈতিক বিবেচনায় তাদের দেখা হয়। উইঘুর মুসলমানদের মধ্যে যারা সম্পদশালী চীন সরকার তাদের ধরে শিবিরে বন্দি করে রেখেছে। তারপর তাদের সম্পদ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ কুক্ষিগত করছে। এমনকি আরও অর্থের জন্য তাদের শরীরটাকেও ছাড় দিচ্ছে না। তাদের যৌন কর্মী হিসেবে পাচার করছে, তাদের চুল আমেরিকানদের কাছে বিক্রি করছে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো বিক্রি করছে।

জিনজিয়াংকে একাত্তর পূর্ব বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করে হার্ডিং বলেন, পূর্ব তুর্কিস্তান আরেকটি বাংলাদেশের মতোই হতে চলেছে। এখানকার জনগণ সিসিপির নিয়ন্ত্রণের শঙ্কায় দিন কাটায় এবং গণতান্ত্রিক সাম্যাবস্থা যেখানে স্বপ্ন হয়েই থাকবে। এটা অবশ্য চীনের চেয়ে আরো ভালো এক প্রতিবেশী দেবে ভারতকে। 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে হার্ডিং বলেন, বাঙালি জনগণের ওপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর গণহত্যা চালায়। 

মধ্য এশিয়ার তার্কিক ভাষাভাষী সংখ্যালঘু মুসলমানরা হলো উইঘুর। এরা হান চাইনিজদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নৃ-গোষ্ঠী। জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমচি বেইজিং অপেক্ষা কাবুলের বেশি নিকটবর্তী। এদের সংস্কৃতিতে মিল মধ্য এশিয়ার সঙ্গে।

২০০৯ সালে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে উরুমচিতে। সেসময় হান চাইনিজদের বিরুদ্ধে উইঘুর মুসলমানরা রুখে দাঁড়ায়। 

হার্ডিং বলেছেন, উরুমচি দাঙ্গার পর চীনের সিসিপি সরকার ওই গোটা অঞ্চলকে খোলা আকাশের নিচে এক জেলখানায় পরিণত করেছে।  উরুমচিতে প্রতি ৬ থেকে ১০ মিটার পর পর ক্যামেরা বসানো রয়েছে। এর মাধ্যমে সব সময় সবার গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি উরুমচিতে বাস করতাম। সেখানে প্রত্যেকটি পরিবারের কেউ না কেউ নিখোঁজ বা গুম হয়ে গেছেন। যাদের পরিবার উরুমচিতে ছিল না, তাদের অন্তত অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য নিখোঁজ ছিলেন। শহরের প্রতিটি জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। পুলিশ মানুষের মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতো। কারো ফোনে যদি ধর্মীয় বা বিদেশি অ্যাপ বা ভিপিএন অথবা এমন কিছু পেতো যা তাদের পছন্দের নয়, তবে পুলিশ এক বা দুই সপ্তাহ পর তাদের বাড়িতে যেত। আর এরপরই ওই বাড়ির কেউ না কেউ নিখোঁজ হতেন। কোথাও লুকানোর কোনো জায়গা নেই। যত রকম প্রযুক্তিগত সুবিধা তাদের কাছে রয়েছে তার সবই ব্যবহার করা হতো। চীন ফোনের জিপিএস ব্যবহার করে তাদের নজরদারিতে রাখছে। ফোনের সব ধরনের অ্যাপের কার্যক্রমে চোখ রাখছে তারা। মানুষের তথ্য সংগ্রহের কাজে হাজার হাজার কর্মী পোষে চীন সরকার। 

হার্ডিং তার এক বন্ধুর প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে আমার এক বন্ধু নিখোঁজ ছিল। সে ছিল উইঘুর, তবে সবার কাছে সে নিজেকে খ্রিস্টান বলতো। ওই বছরের পর থেকে আমি তার কোনো খোঁজ পাইনি। তবে সে ছাড়া পেয়েছে খবর পেয়েছি। আমার ধারণা, তাকে এখন জোর করে শ্রমিক বানানো হয়েছে।

হার্ডিং তাদের স্বায়ত্ত্বশাসন, মানবাধিকার, সমতা এবং স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামকে স্বীকৃতি দিতে গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেইসঙ্গে পূর্ব তুর্কিস্তানের নির্বাসিত সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন জানানোর মাধ্যমে সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান। 

তিনি বলেন, পূর্ব তুর্কিস্তানের মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু চীনের অর্থনীতির প্রলোভনে বিশ্ব তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিশ্চিত ভবিষ্যত গড়ে দিতে তাদের প্রতি আমাদের সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। 


আরও পড়ুন

×