ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

বিরল খনিজ-সেমিকন্ডাক্টর: কার হাতে বাণিজ্য যুদ্ধের ‘ট্রাম্প কার্ড’

বিরল খনিজ-সেমিকন্ডাক্টর: কার হাতে বাণিজ্য যুদ্ধের ‘ট্রাম্প কার্ড’
×

সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রতীকী ছবি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:২৪ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:১০

মার্কিন বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি নির্ভরশীল সেমিকন্ডাক্টর ও চিপের ওপর। আর এই সেমিকন্ডাক্টর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বিরল খনিজ। যেটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে। তবে চীন এখনো সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে এই পণ্যটি তাদের আমদানি করতে হয় যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে তা এই খনিজ ও প্রযুক্তি পণ্যগুলোকে ঘিরে। ফলে চলতি মাসের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে যে বৈঠক (সম্ভাব্য) হতে যাচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে আছে প্রযুক্তি শিল্পনির্ভর দেশগুলো থেকে শুরু করে এই খাতের হর্তাকর্তারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশ দুটির মধ্যে ‘একেবারে ভিন্ন বাণিজ্য যুদ্ধ’ চলছে। যেটির ধরন তিন মাস আগের শুল্ক যুদ্ধের মতো নয়। কূটনৈতিক আলোচনার বাইরেও চীন তাদের খেলার স্তর বেশ উঁচুতে নিয়ে গেছে। বিপরীতে মার্কিন প্রশাসন চীনের কৌশল বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে।

প্রশ্ন হলো, দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ কীভাবে ভিন্ন মাত্রা পেল? আলোচনার টেবিলে এগিয়ে থাকতে চীন কোন বিষয়টিকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে? বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি কেমন? এই দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধ অন্য দেশগুলোকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

বিরল খনিজ
গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে যে বিষয়টিকে চীনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে সেটি হলো বিরল খনিজ। চীন ৯ অক্টোবর একটি নিয়ম জারি করেছে। যে নিয়মের আওতায় বিরল খনিজ রপ্তানি অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে, বিরল খনিজ কী সেটি দেখা যাক।

বিশ্বে বিরল খনিজের বেশি মজুত এখন চীনের হাতে। ছবি: এএফপি

সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ হলো ১৭টি রাসায়নিক মৌলের একটি গ্রুপ। এগুলোর মধ্যে আছে ল্যান্থানাইড, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম। এগুলো পৃথিবীর ভূত্বকে থাকলেও উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণ বেশ জটিল, ব্যয়বহুল।  

আর বিবিসির তথ্য, যাবতীয় প্রযুক্তি পণ্য তৈরিতে এটি কাজে লাগে। সেটা হতে পারে সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন কিংবা সামরিক সরঞ্জাম। কেবল একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরিতে প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম বিরল খনিজের প্রয়োজন হয়। 

নিউল্যান্ড গ্লোবাল গ্রুপ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক নাতাশা ঝা ভাস্কর বলছেন, বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটরের চুম্বক তৈরিতে যে পরিমাণ ধাতুর প্রয়োজন হয় এর ৭০ শতাংশ আসে চীনের বিরল খনিজের রপ্তানি থেকে।

ট্রাম্পের এশিয়া সফর
আগামী রোববার মালয়েশিয়ায় শুরু হবে আসিয়ানের সম্মেলন। ট্রাম্প শুরুতে সেখানে যোগ দেবেন। এরপর সফর করবেন জাপান। ৩১ অক্টোবর অংশ নেবেন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনে। যেটি অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেখানেই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এখানে একটু খেয়াল করলে দেখা যাচ্ছে- চীন যেসব দেশ থেকে সেমিকন্ডাক্টর আমদানি করে সে সব দেশ সফর শেষ করেই জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্প বৈঠকে বসবেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট তাদের এক নিবন্ধে বলেছে, ট্রাম্পের এশিয়া সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ চুক্তির চেষ্টা করা। যা শুধু শুল্ক, প্রযুক্তি সীমাবদ্ধতা ও বিরল খনিজের মতো ইস্যুগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি নতুন বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠার দিকেও নজর থাকবে।

চলতি মাসের শেষ দিকে বৈঠকে বসতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। ফাইল ছবি: এএফপি

তবে ট্রাম্প নিজে যে লক্ষ্যের কথা বলেছেন, সেটিতে আছে তাইওয়ান প্রসঙ্গ। জাপানের এনএইচকে ওয়ার্ল্ড এর প্রতিবেদন অনুযায়ী- ট্রাম্প বলেছেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার অন্যতম বিষয় হবে তাইওয়ান।

কেন তাইওয়ান প্রসঙ্গ
প্রযুক্তিখাতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অন্যতম উপকরণ হলো সেমিকন্ডাক্টর। যেটি ‘চিপ যুদ্ধ’ নামেও পরিচিত। সংক্ষেপে বললে সেমিকন্ডাক্টর হলো ইলেকট্রনিক্সের মেরুদণ্ড। চিপ তৈরি হয় এই সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টিভি, গাড়ি, সোলার সেলসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স পণ্যে বিদ্যুৎ পরিবহন কাজে এটি ব্যবহার হয়। 

বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে মূখ্য ভূমিকা পালন করে তাইওয়ান। দেশটির সবচেয়ে বড় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী কোম্পানি হলো টিএসএমসি। স্টিমসনের ১০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, টিএসএমসি সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক বাজারের ৭৮ এবং উন্নত চিপের ৯২ শতাংশ উৎপাদন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। অ্যাপল, গুগল, টেসলা, মাইক্রোসফটের মতো মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো টিএসএমসির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে ২০২৪ সালে তাদের আয়ের ৭০ শতাংশ আসে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি থেকে। 

অন্যদিকে কোম্পানিটিও যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে রেখেছে। তাদের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। 

তাইওয়ানের টিএসএমসি-এর সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। ইলাস্ট্রেশন: নিক্কেই এশিয়ার সৌজন্যে

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বিরল খনিজ। যেটির বৈশ্বিক বড় মজুত চীনের হাতে, ৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। যেহেতু চীন সম্প্রতি বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাই শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই আসবে তাইওয়ান প্রসঙ্গ। কারণ, চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অঞ্চল বলে দাবি করে (তাইওয়ান নিজেদের স্বাধীন দেশ ভাবে)।তাই চীনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানিকে বিরল খনিজ উপাদানযুক্ত পণ্য রপ্তানি করতে হলে বেইজিংয়ের অনুমোদন নিতে হবে। পাশাপাশি সেই পণ্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যও জানাতে হবে। ফলে এ অবস্থায় তাইওয়ান অনেকটা চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সংঘাতের মাঝখানে আটকে গেছে। 

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার
সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোফিয়া কালান্টজাকোস বলেন, চীনের ১৮.৭ ট্রিলিয়ন আকারের অর্থনীতিতে বিরল খনিজ খুব সামান্য অবদান রাখে। অনুমান করা হয় এই পরিমাণ বার্ষিক দেশজ উৎপাদনের ০.১ শতাংশেরও কম। কিন্তু এর আর্থিকমূল্য সামান্য হলেও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে এটি চীনকে প্রভাব খাটানোর সুযোগ দেয়।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন- চীন বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করার নীতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের পর। মার্কিন সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে নির্দিষ্ট বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে। দেশটির এমন উদ্যোগ চীনে সর্বাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ সীমিত করতে পারে। সিএনএন-এর তথ্য, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১.৭ বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর আমাদনি করে চীন।

কার হাতে ‘ট্রাম্প কার্ড’
দুই দেশই যখন পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, তখন আসন্ন বৈঠকে ট্রাম্প কার্ড কার হাতে? আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের জ্যেষ্ঠ ফেলো (অস্থায়ী) ডেক্সটার টিফ রবার্টস আল জাজিরাকে বলেছেন, বেইজিং ট্রাম্পের আচরণ বুঝে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেকে ‘বিগ ডিল মেকার’ মনে করেন। ফলে তিনি চীনের সঙ্গে কোনো চুক্তি করলে সেটি বড় চুক্তিই হবে। চীনও চায় যুক্তরাষ্ট্র বড় চুক্তি করুক। তবে সে চুক্তি করতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে ছাড় দিতে হবে। এই ছাড় নিয়ে দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে চীন আগে থেকেই হাতিয়ার তৈরি করে রেখেছে। সেটি হলো- বিরল খনিজ।

আরও পড়ুন

×