এক্সপ্লেইনার
সাবমেরিন-গোপন সুড়ঙ্গ: মেক্সিকোর মাদকসম্রাটরা কতটা প্রভাবশালী
মেক্সিকোর মাদকসম্রাট এল চাপো ও এল মেনচো। কোলাজ
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৫৬ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০:৪১
গোপনে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন কুখ্যাত মাদকসম্রাট নেমেসিও গুসেগুয়েরা ওরফে এল মেনচো। এমন তথ্য পাওয়ার পর মেক্সিকোর জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের একটি আস্তানা থেকে রোববার মেনচোকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। পরে তিনি মারাও গেছেন। এ খবরের সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬২ জন।
লাতিন আমেরিকার দেশটিতে কোনো মাদকসম্রাট কিংবা তাদের স্বজন গ্রেপ্তার বা নিহতের পর এমন সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। ঠিক ৩ বছর এক মাস আগে গ্রেপ্তার হন আরেক মাদকসম্রাট হোয়াকিন গুজম্যান ওরফে এল চাপোর ছেলে অভিদিও গুজম্যান। এরপর মাদক ব্যবসায়ী চক্র ও সেনাসদস্যদের সংঘর্ষে ২৯ জন প্রাণ হারান।
অভিদিও গুজম্যান ছিলেন কুখ্যাত সিনালোয়া কার্টেলের (মাদক ব্যবসায়ীদের চক্র) শীর্ষ সদস্য। তাঁর বাবা এল চাপো ছিলেন এই কার্টেলের নেতা। যিনি তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, এর মধ্যে দুবার উচ্চ নিরাপত্তার জেল থেকে পালাতে সক্ষম হন। মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাপোর সিনালোয়া কার্টেল মেক্সিকোর মাদক ব্যবসার ৪০-৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বার্ষিক আয় প্রায় ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সবশেষ গ্রেপ্তারের আগে ২০১৪ সালে এল চাপো দাবি করেছিলেন, তিনি নিজে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন।
এল মেনচো: সাবমেরিন দিয়ে মাদক বিক্রি
শুরুতে বলে রাখা প্রয়োজন মেক্সিকোর প্রধান দুটি মাদক অপরাধ চক্র গড়ে উঠেছে দুটি অঙ্গরাজ্যকে ঘিরে। এল চাপো ছিলেন সিনালোয়া রাজ্যের। ফলে তাঁর নেতৃত্বাধীন চক্রের নাম ‘সিনালোয়া কার্টেল’। আর এল মেনচো ছিলেন জালিস্কোর। তাঁর চক্রের নাম ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’। সিনালোয়ার পর এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম চক্র হিসেবে পরিচিত। এমন আরও দুটি বড় চক্র আছে লাতিন আমেরিকার দেশটিতে।
আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, জন্মস্থানের সূত্রে এল মেনচো জালিস্কোর প্রতিবেশী রাজ্য মিশোয়াকানের বাসিন্দা ছিলেন। প্রচলিত আছে, মাদকসম্রাট হওয়ার আগে তিনি ছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা। ১৯৯০-এর দশকে মেক্সিকোতে মাদক পাচারের অন্ধকার জগতে তাঁর উত্থান ঘটে। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হেরোইন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে ৩ বছর কারাভোগ করেন।
মার্কিন সাময়িকী রোলিং স্টোন ২০১৫ সালে মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) বেনামি সাবেক ফিল্ড এজেন্টের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, হুমকি হিসেবে এল মেনচো একবার মেক্সিকান এক আইনজীবীর কাছে বরফের বাক্সে শূকরের মাথা পাঠিয়েছিলেন।
মেক্সিকোতে জালিস্কো নিউ জেনারেশনের প্রভাব বাড়লে এল মেনচো সাবমেরিন তৈরির পেছনে বিনিয়োগ করেন। যেটি দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার হতো। রোলিং স্টোন জানায়, সাবমেরিনগুলোর নকশা তৈরিতে সহায়তার জন্য রাশিয়ার নৌ-প্রকৌশলীদের নিয়োগ করা হয়েছিল।
এল মেনচো ওয়াশিংটনের মোস্ট ওয়ান্টেড পলাতকদের একজন ছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তারে সহায়তা করলে ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সিকিউরিটির সহযোগী অধ্যাপক অ্যানেট আইডলার আলজাজিরাকে বলেন, এল মেনচোর মৃত্যু প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি জালিস্কো কার্টেলকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনে রূপান্তর করেছিলেন।
এল চাপো: সুড়ঙ্গের রাজা
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকোতে এক সময় প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল ফেলিক্স। তাঁর সহকারী হিসেবে এল চাপো ১৯৮০ সালের দিকে অপরাধ জগতে জড়ান। মিগুয়েলের অধীনে তিনি ছিলেন আকাশপথে মাদক পাচার বিশেষজ্ঞ। পরে নিজেই সিনালোয়া কার্টেলের নেতা হয়ে ওঠেন।
১৯৯৩ সালের ৯ জুন মেক্সিকোতে হত্যা এবং মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে চাপো প্রথমবার গ্রেপ্তার হন। সাজা হয় ২০ বছরের। কিন্তু ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি মেক্সিকোর জালিস্কোর একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার থেকে পালিয়ে যান। পলাতক জীবনে তিনি ফের সিনালোয়া কার্টেলের শীর্ষস্থানীয় সদস্য এবং মেক্সিকোর মাদক ব্যবসার নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, ২০০১ সালের পর চাপো বিশ্বের এক নম্বর পলাতক আসামি ছিলেন। ফোর্বস সাময়িকীর শীর্ষ বিলিয়নিয়ারদের তালিকায়ও তাঁর নাম ছিল। ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সিনালোয়ার একটি সাধারণ রিসোর্ট থেকে তিনি দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার হন। পরের বছরের ১১ জুলাই পালিয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের মেক্সিকো সেন্টারের পরিচালক টনি পাইয়ান ২০১৬ সালে একটি নিবন্ধে লিখেন, এল চাপোকে দ্বিতীয়বার জেল পালাতে সাহায্য করেছিল মেক্সিকোর প্রশাসকরা। এটি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এনরিকে পেনা নিয়েতোর জন্য ছিল একটি আন্তর্জাতিক লজ্জার বিষয়।
সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের তথ্য সংরক্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা দ্য মব মিউজিয়াম। তাদের ওয়েবসাইটে এল চাপোকে নিয়ে লেখা হয়েছে, তিনি ছিলেন উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। মাদক পাচারের জন্য সুড়ঙ্গ ব্যবহার করা তাঁর কোনো নতুন আবিষ্কার ছিল না। ১৯৯০ সালের ১৭ মে কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির একটি সুড়ঙ্গের সন্ধান পায়। সেটি ছিল মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে প্রবেশের একটি পথ।
ওই সুরঙ্গে পর্যাপ্ত আলো, বাতাস ও রেল চলাচলের ব্যবস্থা ছিল। ১৯৮৯ সালে নির্মিত সুড়ঙ্গটিকে সুপরিকল্পিত ও ব্যয়বহুল আন্তঃসীমান্ত ভূগর্ভস্থ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থাপত্যবিদ্যার এই পদ্ধতিটি পরে অন্যান্য মাদক কার্টেলগুলোও অনুসরণ করে। মব মিউজিয়াম লিখেছে, এল চাপোর জন্য মাদক পাচারের ক্ষেত্রে সুড়ঙ্গই ছিল সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি চাপো তৃতীয়বার গ্রেপ্তার হন। মেক্সিকান নৌবাহিনীর সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের বন্দুকযুদ্ধের সময় নিহত হন অন্তত পাঁচজন।
অন্যান্য চক্র
গালফ কার্টেল: বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকোর পুরোনো অপরাধ চক্রগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন ও মারিজুয়ানা পাচারের জন্য এই চক্র বেশি পরিচিতি। ধারণা করা হয়, এটি কলম্বিয়ার কার্টেলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত। ১৯৯০-এর দশকে গালফ কার্টেলের মাদক ব্যবসা থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় হতো। সরকারি কর্মকর্তাদের নিজেদের পক্ষে রাখার জন্য চক্রটি রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং ঘুষের আশ্রয় নিয়ে বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল।
গালফ কার্টেলের প্রাথমিক নেতৃত্বে ছিলেন হুয়ান গার্সিয়া আব্রেগো। তিনি ছিলেন এফবিআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড-১০’তালিকাভুক্ত প্রথম মেক্সিকান মাদকসম্রাট। ১৯৯৬ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। তাঁর উত্তরসূরি ওসিয়েল কার্ডেনাস গুইয়েন কার্টেলের সামরিক শাখা গড়ে তোলেন। তিনি মেক্সিকোর বিশেষ বাহিনীর দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যদের কার্টেলে নিয়োগ দেন।
লস জেতাস কার্টেল: গালফ কার্টেলের বিদ্রোহী সদস্যরা ২০১০ সালে এই চক্র গড়ে তোলেন। পরে দুই চক্রের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালের দিকে জেতাস তাদের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সিনালোয়া কার্টেলকে ছাড়িয়ে তারা মেক্সিকোর বৃহত্তম মাদক চোরাচালানকারী দলের স্বীকৃতি পায়। ধারণা করা হয়, সে সময় মেক্সিকোর অর্ধেকেরও বেশি অঙ্গরাজ্যে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত ছিল।
- বিষয় :
- মাদক ব্যবসায়ী
- মেক্সিকো
- অপরাধ চক্র
