বিশ্লেষণ
সংঘাত তীব্র, বাজার অস্থির, সুবিধা পাচ্ছে মার্কিন কোম্পানি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি খাতে মুনাফা লুফে নিচ্ছে কিছু মার্কিন কোম্পানি। প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
স্কাই নিউজ
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:৫৫ | আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ | ১১:৩৫
ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানি খাতে সবসময় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে চেয়েছেন। চলমান সংঘাতে তাঁর সেই লক্ষ্যর কোনো সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে বাজার পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, গুটিকয়েক মার্কিন কোম্পানি এই পরিস্থিতি থেকে বেশ লাভবান হচ্ছে।
সংঘাতের কারণে সব সময় একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবন সংকটে পড়ে। ওলটপালট হয়ে যায় জ্বালানির বাজার। কিন্তু যুদ্ধের এক অদ্ভুত ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো- কিছু শিল্প এই দুর্যোগেও ফুলে ফেঁপে ওঠে। কারণ, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাটাই এভাবে কাজ করে।
এবারের সংঘাতে কয়েকটি মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি বড় ধরনের মুনাফা লুফে নেওয়ার দৌঁড়ে আছে। বাজারের তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর প্রধান এলএনজি বিশ্লেষক টম পার্ডি বলছেন, এই মুহূর্তে স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারকরা জয়ী।
কিন্তু কেন? আসলে এই সংঘাত বিশ্ববাজারে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে। আর মার্কিন কোম্পানিগুলোর এমন কিছু বিশেষ সুবিধা আছে যা তাদের এই শূন্যস্থান পূরণে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে বসিয়ে দিয়েছে।
কাতারের রাস লাফান প্ল্যান্ট সাধারণত বিশ্বের মোট এলএনজি চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ যোগান দেয়। এই গ্যাস জাহাজে পরিবহনের সুবিধার্থে ঠান্ডা করে তরল করা হয় এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সারা বিশ্বে পাঠানো হয়। কিন্তু কাতার জানিয়েছে, অনবরত হামলা এবং জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় তারা রাস লাফান প্ল্যান্টটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শেল গ্যাসের সাম্প্রতিক বিপ্লবের কল্যাণে তারা এখন বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টি তাদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে তা হলো- চুক্তির সময়সীমা। তাদের মোট গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (১০ থেকে ১৫%) আগে থেকে কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে বাধা নেই। ফলে এই কোম্পানিগুলো যখন-তখন স্পট মার্কেটে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারে। তাই যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভের অংকটাও বড় হচ্ছে।
কাতার জানিয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যে যুদ্ধ থেমে গেলেও তাদের প্ল্যান্টটি সচল করতে অন্তত চার সপ্তাহ সময় লাগবে। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী আরেক সংস্থা ‘এনার্জি ফ্লাক্স’ একটি মডেল অনুসরণ করে দেখিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম মাসেই মার্কিন এলএনজি শিল্প প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের ‘উইন্ডফল প্রফিট’ বা অভাবনীয় অতিরিক্ত মুনাফা করতে যাচ্ছে।
সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা সেব কেনেডি বলছেন, ‘রপ্তানিকারক ও তাদের ক্রেতা এবং যারা শেষ বাজারে বিক্রির অপেক্ষায় থাকে তারা যুদ্ধের কারণে অপ্রত্যাশিতভাবে বড় মুনাফা পেতে যাচ্ছে।’ সেব কেনেডি আরও বলেন, যখনই সরবরাহে ধাক্কা বা ঘাটতি তৈরি হয় তখন যেসব খেলোয়াড়দের (কোম্পানি) হাতে অতিরিক্ত সরবরাহের সক্ষমতা থাকে, বাজার তাদের দুহাত ভরে দেয়।
মূল খেলোয়াড়
বাড়তি মুনাফার সম্ভাবনা ইতোমধ্যে মূল খেলোয়াড়দের (কোম্পানি) বাজারমূল্য বাড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। যেমন- মার্কিন কোম্পানি ভেঞ্চার গ্লোবাল প্রথাগত চুক্তির বাইরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিক্রি করে। গত সপ্তাহে কোম্পানিটি জানিয়েছিল, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম এক লাফে ২৮ শতাংশ বেড়ে গেছে (স্পট কার্গো সংক্রান্ত আদালতের একটি রায়ও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে)।
অন্যদিকে, স্পট মার্কেটের ছোট খেলোয়াড় চেনিয়ার এনার্জিরও শেয়ারের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। যদিও কোম্পানিটি জানিয়েছে, চলতি বছরের জন্য তাদের মজুত প্রায় শেষের দিকে। শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলেও ভেঞ্চার গ্লোবাল ও চেনিয়ার এনার্জি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
হিতে বিপরীত হতে পারে
নমনীয়তার সুযোগে কোম্পানিগুলোর চড়া দামে গ্যাস বিক্রির ঘটনাটি হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, বাজার যখন পড়তির দিকে থাকে তখন এই কোম্পানিগুলোকে লোকসানের ঘানি টানতে হয়। এছাড়া কাতার যে বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন এলএনজি রপ্তানিকারকদের পক্ষে তা একা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এলএনজি বিশ্লেষক ম্যাথিউ উটিং স্কাই নিউজকে বলেছেন, এরই মধ্যে অন্যান্য দেশের এলএনজি রপ্তানিকারকরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুনাফা করতে এগিয়ে আসছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেসব দেশই বিজয়ী হবে যারা নিরাপদ এবং বাধাহীন নৌপথে এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে।
উটিংয়ের মতে, বৃহৎ প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, পেরু, মেক্সিকো এবং আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। কারণ তাদের এলএনজি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালির মতো কোনো সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
সব পথ মসৃণ নয়
চলমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পগুলোও খুব মসৃণভাবে চলছে না। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় অনেক মার্কিন শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটের মুখে পড়েছে। পাশাপাশি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামায় আমেরিকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রলের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি চালকরা সাধারণত কম দামে জ্বালানি কিনে অভ্যস্ত। তাই দেশটিতে সামান্য দাম বাড়লেও গ্রাহকদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। জানা গেছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন উদ্যোগের কথা ভাবছেন। বিশেষ বীমা সুবিধার পাশাপাশি তিনি পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী ট্যাঙ্কার নিরাপদে বের করে আনতে নৌবাহিনীর পাহারার পরিকল্পনা করছেন।
- বিষয় :
- জ্বালানি
- সংঘাত
- মধ্যপ্রাচ্য
- মুনাফা
- যুক্তরাষ্ট্র
