ইরান ৩০ দিনের মধ্যে মীমাংসা চায়, কী আছে ১৪ দফায়
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ সম্বলিত বিলবোর্ডের সামনে নিয়ে হেঁটে যান এক নারী। শনিবার তেহরানে। ছবি: এএফপি
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ১৮:৩৩ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১৮:৫৩
কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো নয়, ইরান চায় স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান হোক। যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া তাদের নতুন ১৪ দফা প্রস্তাবে এমন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান করতে চায়।
ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- ভবিষ্যতে কোনো হামলা না করা, ভূখণ্ডের চারপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, আটকে থাকা শত কোটি ডলারের সম্পদ ছাড় ও সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। আরও আছে- যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা।
পারমাণবিক অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের নিশ্চয়তাও চায় তেহরান। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে শুরু থেকে অলঙ্ঘনীয় সীমা বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে তুলে ধরছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাব উপস্থাপনের পর উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেছেন, ‘এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে। তারা চাইলে কূটনীতি অথবা সংঘাতের পথ অব্যাহত রাখার পথ বেছে নিতে পারে।’
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ইরান তাদের প্রস্তাবে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। আলজাজিরাকে পল বলেন, আগের প্রস্তাবের শর্তে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অবিলম্বে বন্ধের কথা বলেছিল। এবার সম্ভবত সেই শর্তটি নমনীয় করেছে।
পল মাসগ্রেভ বলেন, এর বাইরেও প্রস্তাবে অনেক বিষয় আছে। যেমন- পরমাণু কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা ধরে রাখা এবং হরমুজ প্রণালিতে ‘নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’র কথা এবার তারা বেশ কৌশলে উপস্থাপন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু মেনে নেবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সামনের দিনগুলোতে ইরান কোনো উসকানি দিলে জবাবে হামলা হলেও হতে পারে। ফ্লোরিডার স্থানীয় সময় শনিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরও বলেন, তাঁকে এই চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হলেও, ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ কড়া মেজাজেই প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। হামলা আবারও শুরু হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা যদি বাজে কিছু (উসকানি অর্থে) করে, তবে তেমনটা ঘটার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে।’ ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভালো অবস্থানে আছে। ইরানই একটি সমঝোতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কারণ, গত কয়েক মাসের সংঘাত ও নৌ-অবরোধে দেশটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের ত্রিতা পার্সি আলজাজিরাকে বলেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব হোয়াইট হাউসের অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি। তবে গত ৪৭ বছর ধরে ইরান সব ধরনের অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। সেগুলোর কোনোটিই তাদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি।
চুক্তিতে এখন বাধা কোথায়
নিউ ইয়র্কভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা সুফান সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেনেথ কাৎজম্যান মনে করেন, ট্রাম্পের প্রতি ইরানের অবিশ্বাসই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে মতপার্থক্য তা কমিয়ে আনা সম্ভব। মূল সমস্যা হলো ইরান ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চরমভাবে অবিশ্বাস করে। তাই নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় যেতে চায় না।
কেনেথ কাৎজম্যান বলেন, অবিশ্বাসের এই সমস্যাই যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক তৎপরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ ট্রাম্প প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। মূল জটিলতা সেখানেই। এখন পর্যন্ত উভয়পক্ষ হতাশ হলেও অদূর ভবিষ্যতে আলোচনা হলেও হতে পারে।
