ট্রাম্পের পর বেইজিং সফরে পুতিন
বিশ্ব রাজনীতির চাবিকাঠি কি এখন চীনের হাতে
ছবি : সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০২:১১
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই বেইজিংয়ে পা রাখছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁর বেইজিংয়ে পৌঁছানোর কথা। আপাতদৃষ্টিতে এই সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য হলো, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার ২৫ বছরের পুরোনো পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি উদযাপন করা। তবে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আজ বুধবার সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও পুতিনের মধ্যকার এই শীর্ষ বৈঠকের গুরুত্ব এবং এর সময়কাল– দুটোর গভীরতা অনেক বেশি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে দেশ ছেড়েছেন। ট্রাম্প বড় বড় বাণিজ্য চুক্তির কথা প্রচার করলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার প্রধান বিরোধের জায়গা তাইওয়ান ইস্যু এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এদিকে কাছাকাছি সময়ে দুই পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানিয়ে চীন বিশ্বকে নিজের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক শক্তির জানান দিচ্ছে।
পুতিন ও জিনপিংয়ের কৌশলগত সমীকরণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের খামখেয়ালি পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে পুতিন ও জিনপিং এক শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছেন। তবে এই সফরে বড় কোনো নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষক মেরিনা মিরন বলেন, এখানে বড় কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই; বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ব্যবসা ও সামরিক প্রযুক্তির আদান-প্রদানের মতো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলো আরও জোরদার হবে।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র রাশিয়া বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাটভও একই সুর মিলিয়ে বলেন, তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত স্থিতিশীল ও কৌশলগত। তারা একে অপরের কৌশলগত অংশীদার হলেও স্বার্থের জায়গায় তাদের কিছুটা ভিন্নতা আছে। যেমন– চীন চায় রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ সস্তায় লুফে নিতে, অন্যদিকে রাশিয়া ড্রোন উৎপাদনসহ বিভিন্ন সামরিক কাজে চীনা প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ক্ষমতার কেন্দ্রে কি এখন চীন?
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, এই মুহূর্তে জিনপিংয়ের চেয়ে পুতিনের এই বৈঠকের প্রয়োজন অনেক বেশি। ইউক্রেনে পুতিনের বিপর্যয়কর যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল।
চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া ও ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েশন ফেলো টিমোথি আশ বলেন, রাশিয়া এখন চীনের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল এবং পুতিন হয়তো বেইজিংয়ের থেকে আরও সামরিক সহায়তা চাইতে পারেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প যেভাবে বেইজিংয়ের কাছে হাত পাততে গিয়েছিলেন, পুতিনকেও অনেকটা সেভাবেই যেতে হচ্ছে এবং আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি এখন চীনের হাতে।
তবে ওলেগ ইগনাটভ এই সম্পর্ককে কেবল উঁচু-নিচু স্তর দিয়ে মূল্যায়ন করতে রাজি নন। তাঁর মতে, দুই দেশই আসলে একটি বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়তে চায়, যেখানে কোনো একক দেশের আধিপত্য থাকবে না।
যুদ্ধের পটভূমিতে এক নিরপেক্ষ পরাশক্তি
বিশ্ব যখন ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তখন চীন নিজেকে একটি অপরিহার্য ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। গবেষক মেরিনা মিরন ব্যাখ্যা করেন, চীন নিজেকে এমন এক নিরপেক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে দেখাতে চায়, যার কোনো শত্রু নেই। যদিও চীন রাশিয়ার অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ, তবুও তারা প্রকাশ্যে কোনো পরাশক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে কূটনৈতিকভাবে নিজেদের একটি নিরপেক্ষ পরাশক্তি হিসেবে জাহির করছে।
