সমঝোতার স্মারকের ১৪ দফা প্রকাশ, যা আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত নথিতে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৪:১৭ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৩:০১
যুক্তরাষ্ট্র বুধবার ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের দফাগুলো প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। নিজেদের কাছে মজুত থাকা ইউরেনিয়ামের নিষ্পত্তি সংক্রান্ত পদক্ষেপও নেবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ইরানের অর্থনীতি ও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। দেশটির অর্থনীতিতে অন্তত তিনশ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন করা হবে। এখনও দুই দেশ এতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেনি। তবে কয়েক মাস ধরে চলে আসা রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসানের প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই সমঝোতাকে ঘিরে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবর বলছে, এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ১৪ দফার ওই নথি পড়ে শোনান। হরমুজ প্রণালি খোলা থেকে শুরু করে ইরানের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা সীমিতকরণের মতো বিষয়গুলো রয়েছে এতে।
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই সিএনএন ১৪ দফার একটি নথি প্রকাশ করে। সে সময় এক হোয়াইট হাউস মুখপাত্র জানান, সিএনএনের প্রকাশ করা শর্তের সঙ্গে আসল সমঝোতার ভাষার মিল নেই। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতার দফাগুলো প্রকাশের পর সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের প্রকাশ করা সংস্করণের কিছু ভাষাগত পার্থক্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।
এদিকে, এসব ডামাডোলের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। যদি তাঁর সমঝোতার শর্ত পছন্দ না হয়, তাহলে আবারও ইরানের ওপর বোমাবর্ষণ হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘না, এটি চূড়ান্ত নয়। এটি সমঝোতা স্মারক। আর আমার যদি এটি পছন্দ না হয়, তাহলে আবারও আমরা তাদেরকে লক্ষ্য করে গোলাগুলিতে ফেরত যাব। তাদের ওপর বোমা ফেলব।’
জি৭ সম্মেলন স্থলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিনিয়োগের বিষয়টিও ক্ষুব্ধভাবে অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দশ পয়সাও দিচ্ছে না। তবে তিনি বিষয়টির অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। তিনি সে সময় আভাস দেন, হয়তো উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো শর্তসাপেক্ষে ইরানের ভালো আচরণের ভিত্তিতে এটি করতে পারে। প্রসঙ্গত, পরে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা নথিতেও তেমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত সমঝোতার দফাগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে যাওয়ার বিষয়টি রয়েছে। সমঝোতায় স্বাক্ষরের পর তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমঝোতায় স্বাক্ষরের সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল পূর্বের সক্ষমতায় ফিরবে। আরও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত সমঝোতার ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ছাড়াও বলা হয়েছে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর ইরান ৬০ দিনের জন্য নিরাপদে বাণিজ্যিক নৌযান পারাপারে সহায়তা করবে। এ সময় তারা কোনো টোল নেবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকটিতে দুই পক্ষ স্বাক্ষর করবে আগামীকাল শুক্রবার।
ট্রাম্পের দাবি
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এ সমঝোতা স্মারক কয়েক সপ্তাহের আলোচনার প্রচেষ্টায় হয়নি। বরং কয়েক বছর ধরে এই সমঝোতায় আসার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এটি তিন সপ্তাহের চুক্তি নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে। কেন জানেন? কারণ আমিই সেই ব্যক্তি যে জেনারেল সোলেইমানিকে হত্যা করেছিলাম। আমি যদি জেনারেল সোলেইমানিকে হত্যা না করতাম, তাহলে আমরা হয়তো এ চুক্তি নিয়ে এখন কথা বলতাম না।’
প্রসঙ্গত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে প্রাণ হারান সোলেইমানি।
যা আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত নথিতে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত সমঝোতার নথিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে যুদ্ধ থামানোর কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় আরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সমঝোতায় বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অন্যের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
এতে আরও বলা হয়েছে, এটি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ৬০ দিনের আলোচনার পথ সুগম হবে, যা নিয়ে যাবে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে। পারস্পারিক আলোচনার ভিত্তিতে সে সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
নথিতে আছে, আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে, যা তেহরানকে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত সমঝোতায় ইরানের প্রতি আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত দফাগুলোর একটিতে দেখা গেছে, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তারা নিজেদের পরিশোধিত ইউরেনিয়ামের মজুতেরও নিষ্পত্তি করবে। দেশটির নিজ পারমাণবিক প্রয়োজনীয়তা ও ইউরেনিয়াম পরিশোধন ইস্যুর সমাধান করা হবে পরে ৬০ দিনের আলোচনায় নির্ধারিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে।
এদিকে, চূড়ান্ত চুক্তির আগ পর্যন্ত ইরান নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিতে স্থিতিবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে জব্দ রাখা ইরানি তহবিল ছাড়ের কথাও। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রি করতে দেবে।
যা বলছেন জি৭ নেতারা
এদিকে, জি৭ নেতারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সহায়তা করার প্রস্তাবও দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা ওই প্রণালিতে টোলমুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি বলে অভিহিত করেছেন।
ভবিষ্যতে আবারও হরমুজ প্রণালি প্রভাবিত হলে যাতে সমস্যা না হয়, সে লক্ষ্যে তারা নিজেদের জ্বালানি সরবরাহের ভিন্ন ভিন্ন পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন। লেবাননে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
- বিষয় :
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট
- ইরান
- ওয়াশিংটন ডিসি
