ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতায় ১৪ দফা, এগুলোর অর্থ কী
স্বাক্ষর করা নথি হাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
বিবিসি
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৩:৪৪
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা পৃথকভাবে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই তা কার্যকর হয়েছে। বিবিসিকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা। এই প্রাথমিক চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামে পরিচিত ১৪ দফার এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না। একইসঙ্গে দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সমঝোতা বা প্রাথমিক চুক্তির ১৪টি দফা, সেগুলোর অর্থ এবং একটির সঙ্গে অন্যটির যুক্ততার বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:
১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ
ফ্রান্সের ভার্সাই শহরের ঐতিহাসিক প্রাসাদে (প্যালেস অব ভার্সাই) স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেবে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত।
তবে এই বিষয়টিতে ইসরায়েল কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের উদ্বেগ, হিজবুল্লার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে। অন্যদিকে বুধবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, লেবাননে ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত থাকলে তা সমঝোতার লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, এখন থেকে কোনো পক্ষই সামরিক অভিযান শুরু করবে না বা একে অপরকে হুমকি দেবে না। একইসঙ্গে তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটবে।
২. ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ সম্মান প্রদর্শন
মার্কিন কর্মকর্তাদের পড়ে শোনানো নথির ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে। একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
এই অংশটি ইরানের সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সহায়তা যাচ্ছে।’ এর কিছুদিন পর যুদ্ধ শুরু হয়।
৩. দুই মাসের সময়সীমা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে উভয়পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
দুই দেশের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার পর থেকেই ৬০ দিনের এই গণনা শুরু হয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বুধবার রাতে ভার্সাই প্রাসাদে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প নথিতে স্বাক্ষর করেন।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও নিজ দেশে অবস্থান করে এতে স্বাক্ষর করেছেন। এর আগে ট্রাম্প এবং ইরানি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে। তবে এখন সেটি আদৌ হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
৪. যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার করবে
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ অবরোধ এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা যেকোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
চুক্তি ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর দিয়ে কত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে, সেটি নির্ভর করবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে কয়টি জাহাজ চলাচল করতে দিচ্ছে তার ওপর।
চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাস্তবে এর অর্থ হলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন করা সামরিক বহর যেখানে ছিল সেখানে ফিরে যাবে।
৫. হরমুজ প্রণালি
ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপদ পথ নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেবে। এর জন্য কোনো টোল নেওয়া হবে না। নথিতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিগত ও সামরিক বাধা দূর করা এবং মাইন অপসারণ অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে।
চুক্তি নিয়ে ব্রিফিংয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে কোনো টোল দিতে হবে না। নথিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে একটি বৃহত্তর চুক্তি তৈরির জন্য ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরান কাজ করবে।
৬. ইরান পুনর্গঠনে অর্থায়ন
যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থায়ন ব্যবস্থার বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর্থিকভাবে এতে যুক্ত থাকবে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানকে ‘এক পয়সা অর্থ দিতে’ বা এই তহবিলে অবদান রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য নয়। উদাহরণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরান যদি ভালো আচরণ করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ ইরানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের আওতায় থাকা নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত।
তবে এটি কখন থেকে কার্যকর হবে সেই সময়সীমা স্পষ্ট নয়। নথিতে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এই সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। তবে উভয়পক্ষই স্বীকার করেছে যে, পরবর্তী আলোচনায় তারা এই বিষয়টি অবিলম্বে সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করবে।
নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামের অভিযানের লক্ষ্য ছিল তেহরানকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
৮. কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা কেনার পথ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। একইসঙ্গে তেহরানের কাছে বর্তমানে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, সেটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয়পক্ষ আলোচনা করতে রাজি।
এই উপাদান কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। নথিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী আলোচনায় এ বিষয়ে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে। তবে ন্যূনতমভাবে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ওই ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমিয়ে আনা হবে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শুরুতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার ৯৯.৯ শতাংশ লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা ঠেকানো।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এই প্রাথমিক চুক্তিটি শর্ত পূরণের ভিত্তিতে কার্যকর হবে। তাই সপ্তম দফায় উল্লেখ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি অষ্টম দফার শর্ত মানার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেই কেবল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে।
৯-১০. ‘স্থিতাবস্থা’
এই দুই দফায় বলা হয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।
বাস্তবে এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। এ সময় দেশটি তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা- যেমন ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেবে।
১১. জব্দ করা অর্থ
এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে ছিল। নথিতে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করা তহবিল পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে সম্মত হবে। এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
বুধবার এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, কিছু সম্পদ ছাড় দেওয়া হবে। একইসঙ্গে সমঝোতা পরবর্তী আলোচনা চলবে। ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে (বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত) তাহলে তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য আরও ব্যবস্থা নেওয়া (সম্পদ ছাড়) হবে।
১২-১৪. নজরদারি ও চূড়ান্ত আলোচনা
চুক্তির শেষ কয়েকটি দফায় সমঝোতা কীভাবে কার্যকর হবে সে প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতের চুক্তির শর্ত মেনে চলা পর্যবেক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘মেকানিজম’ বা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থাটি কেমন হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সবশেষে, সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
- বিষয় :
- সমঝোতা স্মারক
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
