ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট

জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ

জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৫:১০

বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ পুরোপুরি কাজে লাগাতে স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যকর্মী বণ্টন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; বরং নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, কেয়ারগিভার, অপটোমেট্রিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্টসহ পুরো স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট) আয়োজিত দুটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন ও আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়। সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়।

স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এখনও উদ্বেগজনক

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার জন্য ৪৪ দশমিক ৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে এ সংখ্যা মাত্র ১২ দশমিক ৭৮।

শুধু সংখ্যাগত ঘাটতিই নয়, স্বাস্থ্যকর্মীদের বণ্টনেও রয়েছে বড় বৈষম্য। দেশের ৩২ থেকে ৩৮ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করলেও মোট স্বাস্থ্যকর্মীর প্রায় ৭৫ শতাংশ শহরাঞ্চলে কর্মরত। বিপরীতে ৬২ থেকে ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও সেখানে রয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পর্যাপ্ত দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স তৈরি করতে পারছে না। ফলে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না।

চিকিৎসক আছেন, কিন্তু পরিকল্পনা ও বণ্টনে ঘাটতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার জনসংখ্যার জন্য অন্তত শূন্য দশমিক ৫২ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সে হিসাবে দেশে প্রয়োজন প্রায় ৮৮ হাজার চিকিৎসক। বর্তমানে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা এক লাখ ২৯ হাজারের বেশি হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি এক হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় শূন্য দশমিক ৭২ হলেও সরকারি ব্যবস্থায় কর্মরত চিকিৎসকদের হিসাব ধরলে এ হার আরও কমে যায়।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, চিকিৎসকের মোট সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক মনে হলেও মূল সমস্যা তাঁদের অসম বণ্টন। শহরে চিকিৎসকের আধিক্য থাকলেও গ্রামীণ এলাকায় বাস্তবে চিকিৎসক-জনসংখ্যার অনুপাত প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ কম। অন্যদিকে শহরে তা প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।তাঁদের মতে, ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় চিকিৎসক তৈরির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসকদের কার্যকরভাবে ধরে রাখার নীতি জরুরি।

সবচেয়ে বড় সংকট নার্স ও মিডওয়াইফে

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় সংকট চিকিৎসকের নয়, বরং নার্স ও মিডওয়াইফের।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক হাজার জনসংখ্যার জন্য ১ দশমিক ৪৮ জন নার্স প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৪ জন। এতে প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার নার্সের ঘাটতি রয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার নার্স স্নাতক হলেও তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার রয়েছেন। এতে নিয়োগ, পদসৃজন ও জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বক্তারা বলেন, একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তত তিন থেকে পাঁচজন নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী থাকা উচিত। কিন্তু এ জনবল না থাকায় চিকিৎসকদের অনেক কাজ নিজেকেই করতে হয়, যা রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বীকৃতির অপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যপেশা

আলোচনায় ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্টসহ স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশার যথাযথ স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবের বিষয়টি উঠে আসে। বক্তারা বলেন, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব পেশাজীবীর গুরুত্বও বাড়ছে। বিশেষ করে অপটোমেট্রি পেশার প্রসঙ্গ তুলে তাঁরা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে প্রাথমিক চক্ষুসেবা ও চশমা নির্ধারণের দায়িত্ব অপটোমেট্রিস্টরা পালন করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সামান্য দৃষ্টিজনিত সমস্যার কারণেও বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না। তাঁদের মতে, মাত্র এক ডলারের একটি রিডিং গ্লাস একজন মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। তাই অপটোমেট্রি পেশার বিকাশ এবং সহজলভ্য চক্ষুসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ, নেই জাতীয় কৌশল

গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশে এখনো সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল নেই। বিদেশে চাকরির সুযোগ, লাইসেন্সিং, স্বীকৃতি, ভাষা শিক্ষা ও নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর কোনো ‘ফরেন এমপ্লয়মেন্ট বা ইনফরমেশন ডেস্ক’ও নেই। বর্তমানে মাত্র ৯ দশমিক ৫ শতাংশ চিকিৎসক, ৩ দশমিক ৩ শতাংশ নার্স এবং ৪ দশমিক ৯ শতাংশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। গবেষকদের মতে, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালভিত্তিক ‘ফরেন ইনফরমেশন ডেস্ক’ চালু করে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ও অ্যাক্রেডিটেশন বিষয়ে সহায়তা দেওয়া উচিত।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বিশ্বে এখন ‘ব্রেইন ড্রেইন’-এর পরিবর্তে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এর ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর্মীরা বিদেশে গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের মতে, পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসক, নার্স ও কেয়ারগিভারদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে পাঠানো গেলে একদিকে যেমন বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশি স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।

নিরাপদ মাতৃসেবায় ধাত্রীর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব

আলোচনায় দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের উচ্চ হার এবং নিরাপদ মাতৃসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ মিডওয়াইফদের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

বক্তারা বলেন, মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য উন্নয়নে দক্ষ ধাত্রীর সংখ্যা বাড়ানো এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, চিকিৎসকদের শহরমুখী অবস্থান, নার্স ও মিডওয়াইফের ঘাটতি, অপটোমেট্রি ও ফিজিওথেরাপির মতো পেশার স্বীকৃতি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষণায় স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা গ্রহণ, চিকিৎসক-নার্স-সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ জনবল কাঠামো গড়ে তোলা, গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সময়োপযোগী বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ যেমন কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে, তেমনি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যবাজারেও দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। 

আরও পড়ুন

×