রয়টার্সের বিশ্লেষণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সফল হলে লাভের পথে তেহরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: সংগৃহীত
রয়টার্স
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ১৩:১৭
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যেমন বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, তেমনি ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এমন একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরকে সমর্থকেরা 'ঐতিহাসিক সমঝোতা' হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ইরানের প্রতিপক্ষদের কাছে এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে সই করেন। ১৪ দফার এই চুক্তির আওতায় লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ও স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনার পথ খোলা হয়েছে। চুক্তিটি জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ভার্সাই প্রাসাদে স্বাক্ষরিত হয় বলে জানা গেছে।
লেবাননের বিশ্লেষক সারকিস নাওম বলেন, এটি এমন এক সমঝোতা যা থেকে সহজে পিছু হটা সম্ভব নয়। তার মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রও নতুন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যেতে আগ্রহী ছিল না।
ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে 'কৌশলগত মহাবিপর্যয়' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর যে কৌশল ছিল, এই চুক্তি সেটিকে দুর্বল করে তেহরানকে নতুন বৈধতা ও শক্তি দিয়েছে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোও এই পরিবর্তনে উদ্বিগ্ন। অতীতে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও হামলার অভিজ্ঞতার কারণে তাদের নিরাপত্তা নীতি এখন নতুন করে মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমে আসতে পারে এবং ইরান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আরও সুসংহত অবস্থানে যেতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আইআরজিসি-র ভূমিকা
এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)-এর সম্ভাব্য প্রভাব বৃদ্ধি। রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
তেল, গ্যাস, নির্মাণ, বন্দর, শিপিং, টেলিকম ও অবকাঠামো খাতে তাদের বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক রয়েছে। বিশেষ করে ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ নামের তাদের প্রকৌশল শাখা ইরানের বড় বড় অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে যায়, তাহলে এই শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে আইআরজিসিইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান লাভবান শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য স্থানীয় অংশীদার বাধ্যতামূলক হওয়ায় আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্ভাব্য সুবিধা ও নতুন জটিলতা
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য চুক্তির মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি বাড়বে এবং পুনর্গঠন খাতে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে। এর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার সুযোগ পেতে পারে আইআরজিসি, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করবে।
একজন সাবেক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ জানান, ইরানের তেল খাতে আইআরজিসি-এর প্রভাব এতটাই গভীর যে তাদের পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।
ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে
বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে অনিশ্চিত উপাদান এখনো ইসরায়েল। বিশেষ করে লেবানন ইস্যুতে যেকোনো অস্থিরতা পুরো চুক্তিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি শুধু যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক সমঝোতা নয়-এটি একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে আইআরজিসি-র মতো শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাব আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইরান
- চুক্তি
