ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, এরপর কী

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, এরপর কী
×

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হচ্ছে সোমবার। প্রতীকী ছবি

আল জাজিরা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৩৪ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ২০:২১

সংঘাত অবসানের জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র গত জুন মাসে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি শর্ত ছিল। সমঝোতাটির মেয়াদ আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। 

সমঝোতা হওয়ার কয়েকদিন পর থেকে উভয়পক্ষ শর্ত লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে আসছে। এখন তাই এর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য দুই পক্ষের কেউই তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শনিবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর বিষয়ে আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি।’

এদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। আরাঘচি জানান, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণের লক্ষ্যে ওমানের সঙ্গে একটি পৃথক চুক্তির কাজ চলছে। কেবল রাজনৈতিক সমাধান অর্জন হলেই এই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার নিউইয়র্কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি তুলবে।

এরপর কী
সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রকৃত অর্থ কী- তা নির্ভর করছে আপনি কোন পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করছেন সেটির ওপর।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধ অবসানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। তাই সেটির মেয়াদ বাড়ানো বা নবায়নের কিছু নেই।’ উল্লেখ্য, সমঝোতাটিকে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপান্তরের জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা ছিল। এই আলোচনা পর্বের মেয়াদ ছিল ৬০ দিন।

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সম্প্রতি একটি রদবদল হয়েছে। যা ইঙ্গিত দেয়, দেশটি ভবিষ্যতে পিছু হটার বদলে সম্ভবত আরও কঠোর অবস্থান নেবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। চলতি মাসের শুরুর দিকে আইআরজিসির সাবেক প্রধান মহসেন রেজাইকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর প্রধান করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশমের মতে, এই নিয়োগ ও নেতৃত্বে অন্যান্য পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, ইরান মনে করছে পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে আছে। নতুন করে কোনো আলোচনা শুরু হলে তারা আরও বেশি দাবি তুলবে। যার মধ্যে গাজা যুদ্ধের অবসান থেকে শুরু করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া, এমনকি ইসরায়েলের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সীমিত সুযোগ
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন প্রণালি কেন্দ্রিক বাগাড়ম্বর ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ তীব্র করার ঘোষণা দিয়েছেন। গত শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানকে পুরোপুরি পরাস্তের পর, হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করব।’

একইদিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োগ করবে যা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বার্বারা স্লাভিন আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্পের হাতে তেহরানের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করার মতো কার্যকর হাতিয়ার খুব একটা নেই।

আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে। কৌশলগত তেলের মজুতও প্রায় খালি। বিমানবাহী রণতরীসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামগুলো অতিরিক্ত সময় ধরে সাগরে মোতায়েন আছে। এর অর্থ হলো, সামরিক কৌশলের দিক থেকে ওয়াশিংটনের সামনে বিকল্প একেবারেই সীমিত।

মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের প্রসঙ্গে বার্বারা স্লাভিন বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করে তেহরান প্রমাণ করেছে, তারা নিজেরাই বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলতে সক্ষম। তারা এখানে বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে। সমঝোতা স্মারকটি না মানার কারণে তেহরান ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চরম ক্ষুব্ধ।

স্লাভিনের মতে, কোনো না কোনোভাবে ইরান তাদের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নেবে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের বড় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এই সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে একটি চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু সেটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরে হবে।

শনিবার তেহরানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ দাবি করেন, সমঝোতা স্মারকে ইরান যেসব সুবিধা আদায় করেছে তা তাদের গর্ব ও বিজয়ের প্রতীক। গালিবাফ বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, সামরিক ও রাজনৈতিক উভয়ক্ষেত্রে ইরান চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছে।’

আরও পড়ুন

×