ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালে বিপর্যয়

সংকটময় পর্যায়ে উদ্ধার অভিযান, আশায় স্বজনরা

নিহত ১১৬৬, ৫৯০ বিদেশিসহ নিখোঁজ সাড়ে চার হাজারেরও বেশি

সংকটময় পর্যায়ে উদ্ধার অভিযান, আশায় স্বজনরা
×

ছবি- সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৫:২৬ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২

ফোন বাজছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। মিথু খড়কা প্রতি মুহূর্তেই ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। কখন ওপাশ থেকে স্বামী কমল খড়কার গলা ভেসে আসে! গত বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় শেষবার ভিডিও কলে স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। এর ঠিক দুই ঘণ্টা পরই হিমবাহধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায় নেপালের রসুয়া ও নুওয়াকোটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। 

কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, নিখোঁজ শত শত কর্মীর তালিকায় আটকা পড়েছে কমলের নাম। মিথুর মতো হাজারো স্বজন এখন সুড়ঙ্গের আঁধার চিরে ভেসে আসা অলৌকিক কোনো সংবাদের অপেক্ষায়। সময়ের সঙ্গে আশার প্রদীপ নিভে এলেও তারা আঁকড়ে ধরে আছেন একটাই বিশ্বাস, ‘শরীর না দেখা পর্যন্ত আশা মরে না।’ 

প্রলয়ঙ্করী এই বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। নেপাল সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সপ্তম দিন গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত কেবল নেপালেই ১ হাজার ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ প্রায় চার হাজার মানুষ। অন্যদিকে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জন নিখোঁজের খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম। দুই দেশ মিলিয়ে এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬-এ। নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সাড়ে চার হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ৩৯ দেশের ৫৯০ জন বিদেশি রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন নেপালের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর শত শত শ্রমিক ও প্রকৌশলী। 

সুড়ঙ্গের অন্ধকারে উদ্ধার অভিযান 

ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় নির্মাণাধীন ও চালু থাকা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করা শত শত প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী ও শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ১১টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের অন্তত ৮৯৮ জন কর্মী এখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। 

বর্তমানে এই উদ্ধার অভিযানের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে সুড়ঙ্গগুলোর ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউস। রসুয়ার ২১৬ মেগাওয়াট সম্পন্ন উইপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন কাঞ্চনপুরের ২০ বছর বয়সী অনুশ গুরংয়ের বাবা লক্ষ্মণ গুরং। বাবার শেষ অবস্থান নিয়ে একেকজন সহকর্মী একেক কথা বললেও অনুশের বিশ্বাস, বাবা সুড়ঙ্গের ভেতরেই আটকে আছেন। অনুশ বলেন, ‘আমাদের শেষ আশা এখন ওই সুড়ঙ্গের ভেতরেই। যদি সময়মতো সেখানে পৌঁছানো যেত, তবে হয়তো তাঁকে জীবিত পাওয়া যেত।’ প্রকল্পটিতে ২৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ ৫৭৬ জনেরও বেশি মানুষ। 

একই অবস্থা ৩৭ মেগাওয়াট উইপার ত্রিশূলী-৩বি এবং ১১১ মেগাওয়াট রসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। রসুয়াগাধি প্রকল্পের কোম্পানি সচিব নরনাথ নেউপানে জানান, সেনা সদস্যরা সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ পথ ধরে বহুদূর হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করলেও পাওয়ার হাউসের মাত্র ৭ মিটার আগে গিয়ে পথ সম্পূর্ণ বন্ধ পান। ওই অংশে পৌঁছাতে ভারী ড্রিলিং মেশিন ছাড়া উপায় নেই। 

একই সঙ্গে ৬০ মেগাওয়াটের উইপার ত্রিশূলী-৩ এ প্রকল্পের প্রায় ৪ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর পানির লেভেল আর কাদার স্তূপ ঠেলে এগোতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। সেখানে প্রায় ১২০ মিটার পথ এখনও কাদায় অবরুদ্ধ। স্বজনদের দাবি, পাওয়ার হাউসের ওপরের স্তরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা এবং কন্ট্রোল রুম থাকায় সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক সাহায্য 

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে নেপাল সেনাবাহিনী ও যৌথ উদ্ধারকারী দল ভারী যন্ত্রপাতি ও এক্সক্যাভেটর নিয়ে সুড়ঙ্গগুলোর পথ পরিষ্কারের কাজ চালাচ্ছে। সাহায্য পাঠিয়েছে প্রতিবেশী দেশ চীন ও ভারত। বিশেষ উদ্ধারকারী দল, জীবন শনাক্তকারী আধুনিক যন্ত্র, ড্রোন এবং ওয়াটার পিউরিফায়ার নিয়ে মাঠে নেমেছে চীনা দল। ৯ জন নিখোঁজ নাগরিককে খুঁজতে ৪৪ সদস্যের দল পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়াও। 

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ সামাজিক মাধ্যমে জানান, ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ২৭৯ জন জলবিদ্যুৎ কর্মীকে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও আশপাশ এলাকা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও প্রায় ৬৩৯ জন জলবিদ্যুৎ কর্মী সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসাবশেষে আটকা পড়ে আছেন। 

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নেপালকে আজ চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই বিষয়টি শক্তভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে। 

আরও পড়ুন

×