সিএনএনের বিশ্লেষণ
ইরানের ভেতরে বিভক্তি, বাড়ছে চাপ
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০১:০১
চার দশকেরও বেশি সময় আগে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল ইরান। দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি চেয়েছিলেন, ইরাকের শাসক গোষ্ঠীর অবসান ঘটাতে। সাদ্দাম হোসেন তখন ওয়াশিংটনের ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছিলেন। ইরাকের ওই সংঘাত আধুনিক সময়ের ইরানের জন্য বেশ গুরুত্ব বহন করে। ওই সংঘাতে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের মতাদর্শই এখন তেহরানের ক্ষমতার মসনদে আধিপত্য বিস্তারি অবস্থানে রয়েছে।
ইরাক সংঘাতের সময় ইরানের অবস্থান ছিল অনেকটা এ রকম– কে কত ক্ষমতাশীল তা এখানে বিষয় না, যে যত দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে, সে বিজয়ী হবে। ওই যুদ্ধের পর অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। গত ছয় মাস ধরে চলছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। তবে এখনও তেহরানের অবস্থান আগের মতোই আছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়টি নিয়ে ইরানের ভেতরে তৈরি হয়েছে বিভক্তি। এক পক্ষ চায় বর্তমান অবস্থান থেকে বিজয় ঘোষণা করে সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে ফেলতে। অন্য পক্ষ চায় বিষয়টিকে আরও টেনে নিয়ে যেতে। বিজয় ঘোষণা করে সব অবসানের পক্ষে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অন্য পক্ষে রয়েছে কট্টরপন্থিরা।
মধ্যপন্থিরা প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছেন– সংঘাত নিরসনের সময় ফুরিয়ে আসছে। চলতি মাসে পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যুদ্ধ একটা সময়ে শেষ হতে হবে। এটি আজ শেষ হওয়াই ভালো, যখন আমরা দৃঢ়তা ও সম্মানের অবস্থানে রয়েছি এবং পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করে নিচ্ছে।’ তবে কট্টরপন্থিদের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়েই এসেছে। তারা আপসে রাজি নন। উল্টো নিজেদের কর্মকর্তাদের ‘পশ্চিমঘেঁষা’ বলে সমালোচনা করে জনমত নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত অনির্ভরযোগ্য একটি সত্তা হিসেবে দেখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের মনোভাব হলো, যুদ্ধে না হারার অর্থ তারা জিতেছে।’
কট্টরপন্থিরা পেজেশকিয়ানকে দুর্বল প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখে। তাদের মতে, আগের প্রেসিডেন্ট বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার কারণে দৈবক্রমে পেজেশকিয়ান ওই পদে আসীন হয়েছেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে স্বাক্ষর হওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে।
কট্টরপন্থিরা অভিযোগ তুলেছেন, কর্মকর্তারা ইচ্ছা করে অর্থনৈতিক সংকটকে ভুল পথে পরিচালিত করে জনসাধারণকে চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করছেন। অনেকে আবার অভিযোগ তুলেছেন, সরকার জ্বালানি সংকট তৈরি করে সমঝোতাকে আবশ্যক করে তুলছে।
এদিকে ট্রাম্পও মধ্যপন্থিদের বেকায়দায় ফেলছেন বারবার। এই মুহূর্তে তিনি বলছেন, ইরানকে তিনি মহান করবেন। আবার পরক্ষণেই বলছেন, ইরানকে বোমা ফেলে ধ্বংস করে দেবেন। সব মিলিয়ে ইরানের ভেতরেই এক ধরনের অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন তিনি। অন্যদিকে, এসবের মধ্যে নীরব রয়েছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও। দেখে মনে হচ্ছে, অনির্ভরযোগ্য ট্রাম্পের ওপর ভিত্তি করে তিনি কোনো পক্ষই বেছে নিতে চাইছেন না।
মোজতবা খামেনির আহ্বান
তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মুসলিম বিশ্বকে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ‘আসল শত্রুর’ বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি শত্রুদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর এক লিখিত বার্তায় মোজতবা খামেনি এই মন্তব্য করেন। তাঁর বার্তাটি ইসলামিক ইউনিটি উইক টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হয়েছে। নিজ বার্তায় তিনি বলেন, যারাই মুসলিমদের মধ্যে ‘জেনে বা না জেনে’ বিভক্তি তৈরি করছে, তারাই ইসলামের শত্রুদের সহায়তা করছে। খামেনি প্রশ্ন রাখেন, ফিলিস্তিনিরা ‘এত অসহায়’ অবস্থায় থাকত কিনা, যদি মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য থাকত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় আহত হওয়ার পর গত ছয় মাসে প্রকাশ্যে আসেননি মোজতবা খামেনি। তাঁর বাবা ও পরিবারের ওপর হওয়া ওই হামলা দিয়েই সূচনা হয় ইরান যুদ্ধের। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, গত শুক্রবার একই ধরনের বিবৃতি তিনি ইরানিদের উদ্দেশ করেও দিয়েছেন।
অচলাবস্থার মধ্যে ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাবেক সন্ত্রাসবিরোধী উপদেষ্টা জো কেন্ট। টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যখন সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, তখন বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটবে না ভাবলে বোকামি হবে। কেন্টের মতে, পুরো বিষয়টিই বাস্তবসম্মত।
এর আগে কেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের সাবেক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া স্পেশাল ফোর্সেস ও সিআইএতেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
গত এপ্রিলে ট্রাম্প ইরানে পারমাণবিক আঘাত হানার আভাস দিয়েছিলেন। তিনি সেই সময় হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের দাবি না মানলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। কেন্ট মনে করছেন, ওয়াশিংটন যদি আগের মতো এখনও ইরানে শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটাতে ও দেশটির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চায়, তাহলে শুধু দুটি পথ খোলা রয়েছে ট্রাম্পের হাতে। এর প্রথমটি হলো, স্থল অভিযান, আর দ্বিতীয়টি পারমাণবিক হামলা।
- বিষয় :
- ইরান