ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালে বন্যা

ছেলেকে অনলাইনে দেখে ভেবেছিলেন বেঁচে আছে, চার দিন পর মিলল মরদেহ

ছেলেকে অনলাইনে দেখে ভেবেছিলেন বেঁচে আছে, চার দিন পর মিলল মরদেহ
×

নেপালের চিতওয়ানে দাহের আগে ২১ বছর বয়সী ছেলে আয়ুষ খাড়কার মরদেহের পাশে কাঁদছেন তার মা মুনা খাড়কা। ছবি: রয়টার্স

রয়টার্স

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:২৪

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ২১ বছর বয়সী আয়ুষ খাড়কার নিখোঁজ হওয়ার পর চার দিন ধরে তাকে খুঁজে বেড়িয়েছে পরিবার। কোথাও কোনো খোঁজ না পেয়ে একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অ্যাকাউন্ট অনলাইন দেখানোয় আশার আলোও দেখেছিল স্বজনেরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মরদেহের ছবি দেখে এবং পরে সামনে দাঁড়িয়ে তাকে শনাক্ত করতে হয়েছে পরিবারের সদস্যদের।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

আয়ুষ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। বন্যার আগের রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। পরদিন সকালে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে তাকে অনলাইন দেখানো হয়। এ ঘটনা পরিবারকে বিশ্বাস করিয়েছিল, হয়তো আয়ুষ বেঁচে আছেন।

দুর্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই স্বজনেরা তার সন্ধানে বের হন। আয়ুষের চাচা গণেশ খাড়কা দুই দিন নুওয়াকোটে নেপালি সেনাবাহিনীর মাইথালি ব্যারাকের কাছে অবস্থান করেন। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয়ের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। আয়ুষের নাম, কর্মস্থল ও সর্বশেষ অবস্থান টিমুরে এলাকায়-এসব তথ্য বারবার কর্মকর্তাদের জানালেও তেমন কোনো তথ্য পাননি তিনি।

পরে স্বজনেরা টিমুরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বন্যায় সড়ক যোগাযোগ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য সরকার সব বেসরকারি হেলিকপ্টার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় আকাশপথেও যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

এদিকে আয়ুষের খালা লক্ষ্মী থাপা প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানে তার খোঁজ করছিলেন। বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহগুলো সেখানে উদ্ধার করা হচ্ছিল।

কিন্তু পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য তখনও জানতেন না, দুর্যোগের দিনই কর্তৃপক্ষ এমন একটি মরদেহ উদ্ধার করেছে, যেটিকে আয়ুষের বলে ধারণা করা হয়েছিল।

২৭ আগস্ট লক্ষ্মী মরদেহ শনাক্তের জন্য তৈরি অস্থায়ী একটি কেন্দ্রে যান। সেখানে উদ্ধার করা মরদেহগুলোর ছবি টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হচ্ছিল। একটি ছবি দেখেই তার মনে হয়, সেটি আয়ুষের। লক্ষ্মী বলেন, ‘আমি প্রায় ৭০ শতাংশ নিশ্চিত ছিলাম যে এটি আয়ুষ।’

ছবিটি তিনি গণেশসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের পাঠান। তবে তারা তখনও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। আয়ুষের মা মুনা খাড়কা যাতে ভেঙে না পড়েন, সে কারণে তাকে ছবিটি দেখানো হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা ছবির নানা খুঁটিনাটি মিলিয়ে দেখেন। আয়ুষের থুতনির বাঁ পাশে থাকা একটি তিল ছবিতে দেখা যায়। তার দাড়িও মিলে যায়। বাঁ হাতে নিয়মিত পরা কালো ধর্মীয় সুরক্ষার সুতো বা ‘বুটি’টিও তারা চিনতে পারেন। তবে তারপরও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি তারা।

চার দিনের অপেক্ষার অবসান

এদিকে মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় পরিবারের উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া তথ্য, দীর্ঘ পথ এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা আয়ুষের সন্ধান আরও কঠিন করে তোলে। নিখোঁজদের পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল, শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলো গণকবর দেওয়ার আগে তারা হয়তো চিতওয়ানে পৌঁছাতে পারবেন না।

অবশেষে ৩০ আগস্ট, বন্যার চার দিন পর আয়ুষের মা জানতে পারেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই।

পরদিন ভোররাত ১টার দিকে আয়ুষের পরিবারের সদস্যরা সালিয়ান থেকে চিতওয়ানের উদ্দেশে রওনা হন। রাতভর যাত্রা শেষে সকাল আটটার দিকে তারা সেখানে পৌঁছান। এরপর উদ্ধার করা মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তারা নিশ্চিত হন-এটি আয়ুষই।

কয়েক ঘণ্টা পর প্রায় ৩৫ জন স্বজন নারায়ণী নদীর তীরে জড়ো হন। সেখানেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয় আয়ুষের।

আয়ুষের খালা লক্ষ্মী বলেন, ‘সে জন্মানোর সময় আমরা যেমন আনন্দিত হয়েছিলাম, তেমনি এত অল্প বয়সে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাস করায়ও আনন্দ পেয়েছিলাম। আর এখন সে আমাদের চোখে পানি দিয়ে চলে গেল।’

চার দিন ধরে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের অপেক্ষার এভাবেই শেষ হলো।

আরও পড়ুন

×