ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

বিজেপি-সমর্থক পরিবারের মেয়ে নেহা যেভাবে হয়ে উঠলেন আন্দোলনের অন্যতম মুখ

বিজেপি-সমর্থক পরিবারের মেয়ে নেহা যেভাবে হয়ে উঠলেন আন্দোলনের অন্যতম মুখ
×

নেহা বোরা

হিন্দুস্তান টাইমস

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:২৬ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৫৯

দিল্লির রাজপথে তখন উত্তেজনা। সামনে পুলিশের ব্যারিকেড। এক পাশে বিক্ষোভকারীরা, অন্য পাশে পুলিশ। এর মধ্যেই ব্যারিকেডের ওপর উঠে বসেছিলেন এক তরুণী। হাতে মাইক, কণ্ঠে স্লোগান। কিছুক্ষণ পর তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আটকও করা হয়।

এই তরুণীর নাম নেহা বোরা।

গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন ছাত্র ও যুব আন্দোলনে বারবার দেখা গেছে তাকে। কখনো অনশন মঞ্চে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে, কখনো পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে। নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম, আর এখন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর নিয়ে আন্দোলন-ইস্যু বদলেছে, কিন্তু রাজপথে নেহার উপস্থিতি বদলায়নি।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) জাতীয় সভাপতি নেহা গত কয়েক মাসে একাধিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে শুরু করে ঝাড়খন্ডে চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম এবং এখন ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক-বিভিন্ন ইস্যুতে তাকে রাজপথে সক্রিয় দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয়েছে দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন ঘিরে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভে নেহা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত কয়েক দিনে একাধিকবার তাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।

২৩ দিনের অনশন থেকে রাজপথের নেতৃত্ব

নেহার পরিচিতি অবশ্য একেবারে সাম্প্রতিক নয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলনে তিনি টানা ২৩ দিন অনশন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী সোনম ওয়াংচুকসহ আরও কয়েকজন। ওই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ব্যাপক আকার নেয় এবং এর অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল পরীক্ষাব্যবস্থা ও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ থেকে। পরে এর পরিধি বাড়ে। শিক্ষা, সরকারি জবাবদিহি, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশের আচরণ-এসব বিষয় সামনে আসে।

নেহা তখন থেকেই আন্দোলনের মঞ্চে নিয়মিত বক্তা। তার বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনেও তাকে আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

এরপর ঝাড়খন্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে রাঁচিতে যান নেহা। সেখানে তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়। তাতে অবশ্য থামেননি তিনি। পরে তিনি বলেছিলেন, মুখে কালি ছুড়ে দিলে ভয় পাওয়ার মানুষ তিনি নন। দিল্লির আন্দোলনে প্যালেট গান ও লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর বিহারে গিয়ে বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেন। একের পর এক আন্দোলনে যুক্ত হতে হতে নেহা এখন ভারতের চলমান ছাত্র ও যুব আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।

এর আগে ও পরে বিহারসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদের আন্দোলন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তাকে মাঠে দেখা গেছে। ফলে একজন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রনেতা হিসেবে যে পরিচিতি নিয়ে তার পথচলা শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

এবার ভোটার তালিকা নিয়ে লড়াই

নেহার সাম্প্রতিক আন্দোলনের বিষয়টি আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর নিয়ে ভারতে বিতর্ক চলছে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগকে তালিকা আরও নির্ভুল করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে।

এই প্রেক্ষাপটে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে আন্দোলনে নামে আইসাসহ বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন।

২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। পরদিনও বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। নেহা বোরা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ৪ অক্টোবর তাকে একটি চিহ্নহীন গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে নরেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া থানায় ছেড়ে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পুলিশ অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও করা হয়েছে।

বামপন্থী রাজনীতির পরিচিত মুখ

নেহার বেড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ডে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি থেকে এমএ করেন। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন।  তিনি সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন আইসার জাতীয় সভাপতি।

ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে আইসা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। নেহা সেই সংগঠনের নেতৃত্বে এসে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন।

আগস্টে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ বলা হলেও বাস্তবে সেখানে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বাম রাজনীতির সংকট, জেএনইউর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশ এবং নকশালবাড়ির রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন।

অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর মতে, এগুলোর পেছনে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে।

বিজেপি-সমর্থক পরিবারের মেয়ে

নেহার রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি দিকও আলোচনায় আসে-তার পরিবার। 

তার পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সমর্থক রয়েছেন। ফলে দিল্লিতে এসে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়।

‘ফ্রন্টলাইন’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানিয়েছেন, তার পরিবারের সদস্যরা বিজেপির সমর্থক। রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তার বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এই পারিবারিক বিরোধ তার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে থামাতে পারেনি।

বরং তার নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় তার মা একপর্যায়ে দিল্লিতে গিয়ে পুলিশের পদক্ষেপ কাছ থেকে দেখেন। পরে আন্দোলনকারীদের ভূমিকার প্রশংসাও করেন তিনি। এই অভিজ্ঞতাকে নেহা বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন।

অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা

নেহার পরিচিতির সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আন্দোলনেরও যোগ রয়েছে। এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ অভিজিৎ দীপকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দুজনের তুলনা করছেন। কিন্তু নেহা সেই তুলনাকে গুরুত্ব দিতে চান না। তার অবস্থান-ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা নয়, বরং আন্দোলনে ঐক্যই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘তুলনা নয়, সংহতি।’

এই অবস্থানটিই হয়তো নেহার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি নিজেকে কোনো একক আন্দোলনের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে চাইছেন।

সামনে আরও বড় পরিসর?

নেহার রাজনীতির পরবর্তী গন্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে যাবেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে আপাতত তার অবস্থান পরিষ্কার-ছাত্র ও তরুণদের বিভিন্ন দাবিকে একই বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখা।

নিট থেকে সরকারি চাকরির পরীক্ষা, সেখান থেকে ভোটার তালিকা-ইস্যু বদলেছে, কিন্তু নেহার রাজপথ বদলায়নি।

গত কয়েক মাসে পুলিশের ব্যারিকেড, অনশন মঞ্চ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশ ও দিল্লির রাজপথ-সবখানেই তার উপস্থিতি চোখে পড়েছে। ফলে ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনের যে নতুন নেতৃত্ব সামনে আসছে, নেহা বোরা তার দৃশ্যমান মুখগুলোর একজন হয়ে উঠেছেন।

আরও পড়ুন

×